০৭:২৮ পি.এম
মালয়েশিয়ায় দুই দিনের সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৌঁছেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর এটি হচ্ছে তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর।
রোরবার (২১ জুন) প্রধানমন্ত্রী এবং সফরসঙ্গীদের নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট বিকেলে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রীর এ সফর, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠক, প্রতিনিধিদল পর্যায়ের আলোচনা এবং উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠকে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।
আরও পড়ুন: সচিবালয়ে আইডি কার্ড দৃশ্যমান রাখা বাধ্যতামূলক করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
সফরকে কেন্দ্র করে সরকার এবং ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা আছে, দীর্ঘদিন ধরে শ্রমবাজারভিত্তিক বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক এবার যেভাবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, শিক্ষা, হালাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা এই নতুন ক্ষেত্রগুলোতে বিস্তৃত হবে।
শনিবার (২০ জুন) পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম গণমাধ্যমকে জানান, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর)-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়েও আরেকটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এসময় তিনি বলেন, দুই দেশের সরকারপ্রধানের আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, শিক্ষা, কৃষি, জ্বালানি, হালাল শিল্প, সেমিকন্ডাক্টরসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। এর পাশাপাশি মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, আসিয়ানে বাংলাদেশের সদস্যপদ এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সমর্থন কামনার বিষয়টিও আলোচনা হবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার হচ্ছে মালয়েশিয়া। দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার এবং জ্বালানি, পাম অয়েল, শিল্পের কাঁচামাল এবং বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারীও বটে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, সিরামিক, ওষুধ ও কৃষিপণ্য রফতানির সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেলেও এখনো বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে, ব্যবসায়ীদের মতে, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা এগোলে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং সেই সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
আরও পড়ুন: গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনে আহত তৌফিক শেখের মৃত্যু
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ মন্তব্য করেন, নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী এই সফরটি কেবল কূটনৈতিক দিক থেকে নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তার মতে, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি আলোচনা বিনিয়োগকারীদের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে, পাশাপাশি পারস্পরিক আস্থা বাড়াবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে জনশক্তি খাত ছাড়া বর্তমানে বড় কোনো অমীমাংসিত বিষয় নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমবাজারই আলোচনা কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা ও হালাল অর্থনীতির মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। এবারের সফরের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি পরিবর্তন হওয়ার আশার কথা তিনি জানান।
আনোয়ার শহীদ মনে করেন, দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য বিদ্যমান, তবে বাংলাদেশের রপ্তানির অংশ তুলনামূলক কম। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল পণ্য এবং অন্যান্য মূল্য সংযোজনকারী পণ্যের রফতানি বৃদ্ধি পেলে সেই বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা ও শিল্প খাতে প্রশিক্ষিত কর্মী প্রেরণ করা হলে রেমিট্যান্স আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
আরও পড়ুন: ই-পার্লামেন্টে অনলাইনে যুক্ত হবে সংসদের কার্যক্রম
মালয়েশিয়াপ্রবাসী ব্যবসায়ী এবং বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সাবেক পরিচালক মাহবুব আলম শাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন গতিতে নিয়ে আসতে পারে। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে উৎপাদনশিল্প, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও হালাল শিল্পে আগ্রহ রয়েছে। সফরের পরে সরকারি পর্যায়ে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে ওই আগ্রহ বাস্তব বিনিয়োগে পরিণত হতে পারে।
তিনি জানান, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি দক্ষ জনশক্তির চাহিদা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই কারণে শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে প্রশিক্ষিত কর্মী, প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য বললেন তিনি। এতে রেমিট্যান্স আয় একদিকে যেমন বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি দক্ষ মানবসম্পদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।
মাহবুব আলম শাহ জানান, বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য এটি উপযুক্ত সময়। মালয়েশিয়া বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে। এ খাতে প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সনদায়নে সহযোগিতা দিলে বাংলাদেশের খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নেও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন: ৪ জেলায় নতুন পুলিশ সুপার পদায়ন, দুজন বদলি
মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যৌথ গবেষণা, কারিগরি শিক্ষা এবং শিল্পের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা গেলে তা উভয় দেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে।
ব্যবসায়ীদের মতে, সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সফর-পরবর্তী বাস্তবায়নের ওপর। যদি এফটিএ-সংশ্লিষ্ট আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যায়, বিনিয়োগ সহজ করা যায়, দক্ষ জনশক্তি রফতানি, জ্বালানি সহযোগিতা এবং হালাল অর্থনীতিতে অংশীদারত্ব ক্রমবর্ধমান করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়, তবে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পর এবারের সফরকে শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
আরও পড়ুন: আশুলিয়ায় শতাধিক কারখানা বন্ধ রয়েছে: এসপি মোমিনুল ইসলাম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন