০২:৫৭ এম
দেশের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী জেলা, যেখানে জ্যান্ত মাছ সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন নিয়মিত দুই শতাধিক ট্রাকে জ্যান্ত মাছ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে এ অঞ্চলের মাছ চাষিরা শুধু উৎসাহিত হচ্ছেন না, লাভবানও হচ্ছেন। ক্রেতারাও বাজারে ফরমালিনমুক্ত তাজা মাছ পাচ্ছেন। রাজশাহী বিভাগীয় মৎস্য অফিসের সূত্রে জানা গেছে, জ্যান্ত মাছ ঢাকাসহ বিভিন্ন বাজারে পাঠানোর কৌশলটি দেশে প্রথম আবিষ্কার করেন রাজশাহীর চাষিরা। বর্তমানে রাজশাহীর পবা, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, বাগমারা, মোহনপুর এবং নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম ও সিংড়া উপজেলার চাষিরা এই মাছ ঢাকাসহ সারাদেশে পাঠাচ্ছেন। শুধু রাজশাহী জেলার চাষিরাই প্রতিদিন দুই শতাধিক ট্রাকে জ্যান্ত মাছ ঢাকায় পাঠান। রাজশাহী বিভাগে রুই-কাতলাসহ কার্পজাতীয় মাছ চাষে বিপ্লব ঘটেছে। আটটি জেলায় বছরে উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিকটনের বেশি মাছ। লাভজনক হওয়ায় আগ্রহও বাড়ছে চাষিদের। রাজশাহী বিভাগের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন এই মাছ রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে, আর এতে বিক্রি হচ্ছে ২০ কোটি টাকারও বেশি মাছ। রাজশাহীতে গত কয়েক বছরে পুকুরের সংখ্যা বেড়েছে। লোকসান হওয়ায় বাধ্য হয়ে চাষিরা পুকুর খনন করে মাছ চাষে নামছেন। অন্য ফসলের তুলনায় মাছ চাষ তুলনামূলকভাবে বেশ লাভজনক হওয়ায় এ পেশায় ঝুঁকছেন অনেকে। রাজশাহী বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া জানিয়েছেন, আগে শুধুমাত্র রাজশাহীতে মিশ্র প্রক্রিয়ায় মাছ চাষ হতো, এখন বিভাগে অন্যান্য জেলাতেও এই পদ্ধতি হচ্ছে। পুকুরে প্রধান মাছ যদি রুই হয়, তবে সিলভার কার্প, কাতলাসহ দেশি ছোট মাছও চাষ করা হচ্ছে। এর ফলে পুকুরে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। রাজশাহী জেলা থেকে বড় মাছ ছাড়াও দেশি পাবদা, শিং, কই, মাগুর চাষ হচ্ছে। সেগুলো রাজশাহীর বাইরেও একটি বড় বাজার তৈরি করে ফেলেছে। এ ছাড়া পাবদা মাছ নিয়মিত ভারতে রফতানি হচ্ছে। সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া বলেন, এখানকার চাষিরা নিয়ম মেনে মাছ চাষ করেন এবং বছরে দেড় হাজারেরও বেশি মানুষকে মাছ চাষ বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। তারা নিয়মিত কৃষকের মাছ প্রদর্শনের মতো কর্মসূচি পালন করেন। রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয় জানিয়েছে, বিভাগের আটটি জেলায় মোট পুকুরের সংখ্যা ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৬৫৩টি এবং মাছ চাষিতে সংখ্যা ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৬টি। বছরে ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৪৬৭ মেট্রিকটন মাছ উৎপাদন করা হচ্ছে এবং এর মধ্যে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে দেড় লাখ মেট্রিকটন মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। প্রায় ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, ২৪ বছর আগে রাজশাহী জেলা থেকে তাজা মাছ পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহসহ অন্তত ২৫টি জেলায় প্রতিদিন তাজা মাছ পাঠানো হচ্ছে। এর ফলে রাজশাহীর বাইরের মানুষ ফরমালিনমুক্ত মাছ খেতে পারছেন। ফলে এ বিভাগের মাছের চাহিদা বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানিয়েছে, প্রতিদিন বিকাল থেকে ভোররাতের মধ্যে প্রায় ৫০০ ট্রাকের বেশি তাজা মাছ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়, এবং প্রতি ট্রাকে কমপক্ষে ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি মাছ থাকে। সেই হিসেবে প্রতিদিন ২০ কোটি টাকার বেশি এই তাজা মাছ বিক্রি হয়। রাজশাহী জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাছ চাষ হয় পবা উপজেলায়। পারিলা ইউনিয়নে ঢুকলেই চোখ পড়ে পুকুর আর পুকুর। সেখান থেকে মাছ ধরা হচ্ছে এবং কিছুটা দূরে গিয়ে তা রাস্তায় দাঁড়ানো পানি ভর্তি ছোট-বড় ট্রাকে তোলা হচ্ছে। এই পারিলা গ্রাম থেকেও প্রতিদিন ৫০ ট্রাকের মতো তাজা মাছ যায় ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে। আর পুরো রাজশাহী থেকে ২০০ ট্রাকের বেশি তাজা মাছ পাঠানো হচ্ছে। পারিলা গ্রামের মোশারফ হোসেন ১৪ বছর ধরে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় মাছ পাঠান। প্রায় ২২ বিঘা জমির ওপর তার পুকুর রয়েছে। তিনি জানান, এক সময় রাজশাহীতেই মাছ বিক্রি করতে হতো যেখানে দাম তেমন পাওয়া যেত না। পরে তারা ট্রাকে মাছ নিতে শুরু করেন ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়। তখন ট্রাকে এক-দুজন লোক রাখতে করতে হতো এবং তারা সারা রাস্তা পানিতে পা দোলাতেন। কিন্তু এখন শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি দেওয়া হয় যা সারা রাস্তায় চলে। এর ফলে মাছ পুকুরের মতো করে চলে যায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। ফলস্বরূপ, দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। ওই দিন তিনি ১ হাজার ২০০ কেজি মাছ নিয়ে গিয়েছিলেন ঢাকার নিউমার্কেটে, এবং সেদিন তিন লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছিল ওই মাছ। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার গোলাম সাকলাইন ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নে অনার্স পড়াকালে নিজ এলাকায় মাত্র দুই বিঘা জমিতে মাছ চাষ শুরু করেন। ৭ হাজার টাকা পুঁজিতে শুরু করা চাষে প্রথমবারেই লাভ করেন ৬ হাজার টাকা। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। বর্তমান সময়ে তিনি ১ হাজার বিঘা জমির পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করছেন যা ১৫২ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, কৃষির সঙ্গে মাছচাষকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি এবং মাছচাষ করবো বলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে আমার পরিবারের সদস্যরা সে সময়ে কেউ এই পেশায় আসতে দিতে চাননি। সেই থেকেই শুরু করে আজ পর্যন্ত মাছ চাষ করে যাচ্ছি। বর্তমানে আমার পুকুরের আয়তন প্রায় ১ হাজার বিঘা। এখান থেকে প্রতিদিন ২০টির মতো ট্রাক রাজধানীতে মাছ নিয়ে যাচ্ছে। মিঠা পানির কার্পজাতীয় মাছ উৎপাদনে রাজশাহী বিভাগ দেশের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে এবং নাটোর ও নওগাঁয় মাছের উৎপাদন ও কেনাবেচা বেশি হয়। তবে এসব অঞ্চলের পুকুরগুলোতে রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, পাবদা, ট্যাংরা শিংসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ চাষ করা হয়। এসব মাছ পুকুর থেকে তুলে বিশেষ সংরক্ষণের মাধ্যমে জীবিত অবস্থায় সরবরাহ করা হয় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। দুর্গাপুর উপজেলার অন্য এক মৎস্যচাষি ইদ্রিস আলী জানান, এই উপজেলা থেকে ৫০ ট্রাকের বেশি মাছ ঢাকায় যায়। তবে বর্তমানে মাছের দাম কিছুটা কমেছে। খাদ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, মাছের দাম তেমন বাড়েনি। এতে লাভ কম হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকায় মাছ নিতে বাড়তি ট্রাকভাড়া গুনতে হচ্ছে তিন-চার হাজার টাকা। মৎস্য অধিদপ্তর থেকে আর্থিক কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে নানা রকম পরামর্শ ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়, এবং এতে উপকৃত হওয়া যায়। রাজশাহী বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া বলেন, রাজশাহী অঞ্চলের মাছ চাষে বিপুল পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এখন খাঁচায় মাছ চাষও বেশ লাভজনক হয়েছে। নদীর অনেক দামি মাছও এখন পুকুরে চাষ হচ্ছে। এসবের মধ্যে রয়েছে পাবদা, গুলসা টেংড়া, চিতল, ফলি ইত্যাদি। প্লাবনভূমির শোল, শিং, মাগুর বাণিজ্যিকভাবে চাষ করেও লাভবান হচ্ছেন চাষিরা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন