০৬:০৬ এম
খুলনায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতারা সার ডিলারশিপ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। বরফকলকে গোডাউন হিসেবে এবং সিমেন্টের দোকানকে সার বিক্রির কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মিষ্টির দোকানে সার বিক্রির সাইনবোর্ড ঝোলানো হয়েছে।
টাঙ্গাইলে কট্টর আওয়ামী সমর্থক, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং এমপির ভাতিজা ডিলার নিযুক্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে ঝিনাইদহে ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসন করে সার ডিলারের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গত ৯ অক্টোবর নতুন সার ডিলারদের নাম চূড়ান্ত করে তালিকা প্রকাশের পর জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: জিয়ানগরে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের নগদ অর্থ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্যান বিতরণ
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে নতুন সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ফ্যাসিস্ট পুনর্বাসনের অভিযোগ তুলেছেন নিয়োগবঞ্চিত ব্যবসায়ীরা।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, খুলনার ডুমুরিয়ার গুটুদিয়া ইউনিয়নের সার ডিলার হয়েছেন বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান খান মিন্টুর স্ত্রী লায়লাতুন্নাহার। তিনি বিক্রয় কেন্দ্র হিসেবে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি মফিজুল ইসলাম সানার ভাইয়ের সিমেন্টের দোকানে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠানের নাম জারিফ এন্টারপ্রাইজ।
ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়নের ডিলার হয়েছেন গাজী হাফিজুর রহমান। তিনি গুটুদিয়া ইউনিয়নের বরফকলকে গোডাউন হিসেবে দেখিয়েছেন। মাগুরখালী ইউনিয়নের ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সুকৃতি মণ্ডল। তিনি তার মিষ্টির দোকানে সার বিক্রির সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছেন। আটলিয়া ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন বিএনপি নেতা আবদুল মালেক সরদার।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, হাফিজুর দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় থাকেন। লায়লাতুন্নাহারকে আগে কখনোই সারের ব্যবসায় দেখা যায়নি। ডিলাররা স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
আরও পড়ুন: চরখিরাটীতে সেরা পাঠকদের বই ও গাছের চারা দিল বসুন্ধরা শুভসংঘ
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার জানিয়েছেন, আবেদনে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সরেজমিন পরিদর্শনের তথ্যে কোনো গরমিল রয়েছে কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ভুল তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী বাতিল করা হবে।
টাঙ্গাইলে কট্টর আওয়ামী সমর্থকও ডিলার
টাঙ্গাইলে কট্টর আওয়ামী সমর্থক, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং এমপির ভাতিজা সারের ডিলার নিযুক্ত হয়েছেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা চলছে।
সদর উপজেলার পোড়াবাড়ী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বড়বেলতা গ্রামের আওয়ামী সুবিধাভোগী ও দলের কট্টর সমর্থক আব্দুল মান্নান সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
আরও পড়ুন: কাপ্তাই হ্রদ থেকে পাথরে বাঁধা যুবকের লাশ উদ্ধার, নৌকা মালিক আটক
তিনি পোড়াবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী আজমত আলীর ভাতিজা এবং মেসার্স আব্দুল মান্নান ট্রেডার্সের প্রোপাইটর।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের গত ১৭ বছর আব্দুল মান্নান ও তার আপন চাচা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আজমত আলীসহ পরিবারের সদস্যরা সুবিধা ভোগ করছেন। পদ-পদবি না থাকলেও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজগর আলী বলেন, বিষয়টি শুনেছি।
এদিকে, মির্জাপুরে সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর ভাতিজা মেহেদী হাসান সিদ্দিকীসহ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতা সারের নতুন ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন: পচানালার দূষণে মশার অভয়ারণ্য, শিক্ষার্থীরা ডেঙ্গু আতঙ্কে
বানাইল ইউনিয়ন ওলামা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন টিটু ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যার কোনো দোকান নেই, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই, কোনো গুদামঘর নেই, সে কীভাবে সারের ডিলার পায়?’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী সংগঠন মির্জাপুর উপজেলা জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, সার ডিলার নিয়োগে ব্যাপক দলীয়করণ হয়েছে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন মিয়া জানিয়েছেন, রাজনৈতিক কোনো ব্যক্তি সারের ডিলারশিপ পেয়েছেনÑএমন তথ্য তিনি জানেন না।
ঝিনাইদহে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মা
আরও পড়ুন: রাজবাড়ীতে বিনা টিকিটে রেল ভ্রমণ করায় ৫ জন গ্রেপ্তার
ঝিনাইদহে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসন করে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, সার ডিলার নিয়োগের সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কোনো এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক, কর্মচারী কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের নিকটাত্মীয় ডিলারশিপের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। অথচ হরিণাকুণ্ডুর দৌলতপুর ইউনিয়নে সালেহা বেগম মহিলা কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষক আনিচুর রহমানের স্ত্রী আনোয়ারা নাসরিনকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। আনিচুর-আনোয়ারা দম্পতির মেয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, যা সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এছাড়া মনোনীত অধিকাংশ ডিলারের নিজস্ব কোনো উপযুক্ত সারের গুদাম নেই। সার ডিলার নিয়োগ পেতে অনেকেই ব্যাংকের ভুয়া আর্থিক সচ্ছলতা সনদ এবং মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, পাগলাকানাই ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া রাকিব হাসান বন্ধন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী বলে দাবি করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শাহেদ আহমেদ। অন্যদিকে হরিণাকুণ্ডুর চাঁদপুর ইউনিয়নে ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও ৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ডিলার নিয়োগের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বিএনপি পরিবারের সদস্য সাকিব হোসেন।
আরও পড়ুন: রাজশাহীতে আমির হামজার মাহফিলের অনুমতি দেয়নি প্রশাসন
আওয়ামী পরিবারের লোকজন ডিলারশিপ পাওয়ায় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
হরিণাকুণ্ডুর চাঁদপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সভাপতি এমএ মজিদের বড় ভাই আব্দুল লতিফ এবং জোড়াদহ ইউনিয়নে ওএমএস ডিলার লাল্টু মিয়া সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন।
মহেশপুর উপজেলা যুবলীগের সভাপতি হাসানের ভাই এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনার শ্যালক এহসান রেজা, পৌর এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ির কেয়ারটেকার হাবিবুর রহমান বুল্লা, যাদবপুর ইউনিয়নে আওয়ামী পরিবারের সদস্য সবুর খান এবং বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নে শাকিল রিয়াজ শুভর নাম রয়েছে তালিকায়।
কালীগঞ্জের ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সভাপতির শ্যালকের স্ত্রী সুরমা হাসান এবং শিমলা-রোকনপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সভাপতির চাচাতো শ্যালক নাজমুল হক মিশুর নাম অন্তর্ভুক্ত থাকায় এলাকায় সমালোচনার ঝড় বইছে। জেলা বিএনপির সভাপতির কর্মচারী আনোয়ার হোসেনকেও ডিলার করা হয়েছে। আনোয়ার দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দবির উদ্দীন বিশ্বাস জানিয়েছেন, জেলা থেকে সব নিয়ন্ত্রণ করায় ত্যাগী নেতাকর্মীদের স্বজনরা বাদ পড়েছেন, এমনকি তার ছেলের নামও তালিকায় রাখা হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে রাজনীতি করার কোনো মানে হয় না।
স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা বলেছেন, তার শ্যালক নিজে জেলা বিএনপির দায়িত্বশীল পদে রয়েছে। তাই সে আওয়ামী পরিবারের সদস্যÑএমন অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
হরিণাকুণ্ডুর ইউএনও প্রদীপ্ত রায় দীপন জানিয়েছেন, তার কাছে কোনো সার ডিলারের চূড়ান্ত রিপোর্ট পৌঁছায়নি।
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেছেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সার ডিলার নিয়োগে নজিরবিহীন অনিয়ম, জালিয়াতি ও আওয়ামীপ্রীতির বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি নোমান হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজম মো. আবুবকর জানিয়েছেন, সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে তুঘলকি কারবার ঘটছে। জেলাব্যাপী আত্মীয়করণ, দলীয়করণ ছাড়াও টাকার বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের অন্তরালে আওয়ামী পুনর্বাসন সাধারণ মানুষ মনে নেয়নি।
গৌরীপুরে ফ্যাসিস্ট পুনর্বাসনের অভিযোগ
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ফ্যাসিস্ট পুনর্বাসনের অভিযোগ তুলেছেন নিয়োগবঞ্চিত ব্যবসায়ী ও গৌরীপুর পৌর কৃষক দলের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ কাজিয়েল হাজত মুন্সি। গত সোমবার গৌরীপুর প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ১১ জন নতুন সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, অসাধু চক্র ডিলারপ্রতি ১৫-২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এবং ‘অলিখিত চুক্তি’র গুঞ্জন রয়েছে। যারা সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন, তাদের অনেকেই আওয়ামী ফ্যাসিস্টের দোসর এবং তাদের পরিবার-পরিজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এতে সার বিতরণে ভবিষ্যতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, নতুন সার ডিলার নিয়োগ বাতিলের দাবিতে গত রোববার কৃষি মন্ত্রাণলয়ে লিখিত অভিযোগ দেন উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতারা।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন স্থানীয় প্রতিনিধিরা]
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন