০৫:২০ পি.এম
দুই বছর ধরে বন্ধ হয়ে রয়েছে দেশের একমাত্র গণহত্যা আর্কাইভ। ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলি নষ্ট হচ্ছে যথাক্রমে। কৌশিক দে, খুলনা থেকে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরটির অবস্থান মহানগরী খুলনার সাউথ সেন্ট্রাল রোডের ২৬ নম্বরের ছয়তলা ভবনে। এই স্থাপনার আশপাশের অন্য কোন ভবনের সঙ্গে মিল নেই।
শহরের দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাগুলোর মধ্যে এটি একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনাও বটে। এর ওপর সাদামাটা ও আভিজাত্যের একটি সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’।
এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের গণহত্যা-নির্যাতনের চিহ্ন বহনকারী একমাত্র আর্কাইভ ও জাদুঘর। প্রবেশ পথের ডান পাশে খুলনার প্লাটিনাম জুট মিলের সেই অভিশপ্ত ‘বয়লার’-এর বিধ্বস্ত অংশ রয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে নির্যাতন করে এবং এখানে নির্মমভাবে হত্যা করে।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৬৮৪ জন
গণহত্যার ইতিহাস সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে খুলনায় প্রায় একযুগ আগে এই প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট প্রধান ফটকে ভাঙচুরের পর থেকে এটি আর চালু হয়নি। সরকারি অনুদানের অভাবে জাদুঘরে রক্ষিত ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
জাদুঘরের সংশ্লিষ্ট ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে খুলনায় ২০১৪ সালের ১৭ মে যাত্রা শুরু করে এই আর্কাইভ ও জাদুঘর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের উৎসাহে নগরীর ময়লাপোতাসংলগ্ন শেরেবাংলা রোডের একটি বাড়ি ভাড়া ছিল জাদুঘরের প্রথম ঠিকানা।
২০১৫ সালের আগস্টে তখনকার প্রধানমন্ত্রী নগরীর ২৬ সাউথ সেন্ট্রাল রোডের দুইতলা একটি বাড়ি উপহার দেন। সংস্কারের পর ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ সেই বাড়িতে স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে সংগ্রহশালাটি স্থায়ী ঠিকানা পায়। ২০২৪ সালে সেখানে প্রায় ৩২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর ছয়তলা ভবন নির্মাণ করে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাদুঘরটি স্থাপনা শৈলী ও নকশার দিক থেকে খুলনার অন্যতম সুন্দর স্থাপনাগুলোর মধ্যে পড়ে। ওই বছরের মে মাসে জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়, কিন্তু চালু ছিল মাত্র এক মাস।
২০২৪ সালের ২০ জুলাই সংস্কারকাজ ও কারফিউয়ের কারণে জাদুঘর বন্ধ করে দেওয়া হয়। ৪ আগস্ট গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা না দেওয়ার কারণেই সেখানে ভাঙচুর চালানো হয়। তখন জাদুঘরের মূল ফটকসহ বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই থেকে নিরাপত্তা এবং আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে জাদুঘরটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
আরও পড়ুন: ইসরাইলে নতুন সরকার এলে ফিলিস্তিনিদের ভাগ্য কতটা পাল্টাবে?
জাদুঘরের সংশ্লিষ্টরা জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে অন্যতম বৃহৎ গণহত্যা ঘটে খুলনার ডুমুরিয়ার চুকনগরে। ১৯৭১ সালের ২০ মে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে ওই গণহত্যার শিকার হন ১০-১২ হাজারেরও বেশি নিরীহ মানুষ। এই ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে খুলনায় জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে মুক্তিযুদ্ধ এবং সারা দেশের বিভিন্ন গণহত্যার নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে।
জাদুঘরে রয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর পাঞ্জাবি; শহীদুল্লা কায়সারের দুটি টাই ও ডায়েরি; বিবিসির সংবাদদাতা নিজামউদ্দীন আহমেদের কোট; সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের কলম ও শাড়ি; সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের পাঞ্জাবি, পায়জামা ও পাণ্ডুলিপি; জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার লেখা বই এবং ডা. আলীম চৌধুরীর ভিজিটিং কার্ড, ল্যাম্প, ডেন্টাল টুলকিট ও ডায়েরি।
এসব নিদর্শন শহীদদের পরিবারের সদস্যরা এখানে দান করেন। জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, শহীদদের চিঠিসহ ১৯২ ধরনের নিদর্শন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সাড়ে তিন শতাধিক ছবি রয়েছে। আর্কাইভে ১০ হাজারের বেশি ছবি এবং দুই হাজারের মতো ভিডিওসহ অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য নথি সংরক্ষিত রয়েছে। জাদুঘরটি বন্ধ থাকায় এসব নিদর্শন ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুইজন জানান, জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। ১১ সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হয়ে আসছে। এক্ষেত্রে তাদের দাবি, ‘গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি চালু করার ক্ষেত্রে কোন সাড়া মিলছে না।
আরও পড়ুন: আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলির ঘটনায় জামায়াতের তীব্র নিন্দা
এদিকে, গণপূর্ত বিভাগ অথবা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে জাদুঘর ও আর্কাইভ পরিচালনার জন্য অনুদান নিশ্চিত করা হচ্ছে না। আর্থিক সংকটের কারণে প্রথম পর্যায়ে আট অফিসার ও কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়। নিরাপত্তা, আর্থিক সংকটসহ নানা কারণে এখন জাদুঘরটি বন্ধ হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের খুলনা জেলার সাবেক কমান্ডার ও আহ্বায়ক মো. আবু জাফর গণহত্যা-আর্কাইভ জাদুঘরটিকে দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছেন। তিনি কালের কণ্ঠে বলেছেন, ‘আমরা চাই এটি সংস্কার করে চালু করা হোক। দুষ্কৃতকারীরা ক্ষতি করে গেছে, এমন কারণ দেখিয়ে হাত গুটিয়ে থাকা ঠিক হবে না। ইতোমধ্যে জাদুঘরটি চালুর দাবি জানানো হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে অনেকেই পিছিয়ে যাচ্ছে, সেজন্য সরকারের উচিত মুক্তিযুদ্ধের এই প্রতিষ্ঠানের জন্য এগিয়ে আসা।’
জাদুঘরের ট্রাস্টি সম্পাদক ডা. শেখ বাহারুল আলম জানান, ‘জাদুঘরটি চালু করতে ব্যক্তিগতভাবে অনেকের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমি একাত্তরের সঙ্গে নব্বই, চব্বিশসহ সকল গণ-আন্দোলনের ইতিহাস জাদুঘরে রাখার প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু এর জন্য কোনো সাড়া পাচ্ছি না।’ তিনি বলেন, ‘এখন এখানে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল, স্টাফ বেতনসহ প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টাকা খরচ হয়। সরকারি সহযোগিতা ছাড়া এটি সম্ভব নয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন