০৪:৩৫ পি.এম
নওয়াপাড়া বাজারে প্রতিদিন হাজারো মানুষের ব্যস্ত চলাচল লক্ষ্য করা যায়। কেউ বাজার করতে আসছেন, কেউ কর্মস্থলে ছুটছেন। এই ব্যস্ততার মাঝে হাফেজ ইমাম আকবর আলী (৫৫) নীরবে মানুষের কাছে সহায়তা প্রার্থনা করেন। তিনি জন্মগতভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, কিন্তু তাঁর পরিচয় শুধুমাত্র এটুকু নয়—তিনি একজন ইমাম। প্রতিদিন মসজিদে দাঁড়িয়ে অন্যদের নামাজ পড়ান এবং ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেন। তবে, নিজের সংসারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে তাঁকে মানুষের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়।
অভয়নগর উপজেলার চাপাতলা এলাকার শালবাগানের বাসিন্দা আকবর আলী। তাঁর বাবা আজগর আলী মোল্লা। আকবর আলী চেঙ্গুটিয়া কাঁচা বাজার মসজিদে ইমামতি করেন। মসজিদ থেকে মাসে তাঁর সম্মানী মাত্র ২ হাজার টাকা। এই সামান্য আয়েই তিনি স্ত্রীকে নিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করেন।
আকবর আলীর দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বর্তমানে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে ছোট সংসার চালান। তবে সংসার ছোট হলেও প্রয়োজন তো থেমে থাকে না। প্রতিদিনের খাবার, ওষুধ, পোশাকসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে ২ হাজার টাকা কোনভাবেই যথেষ্ট নয়। ফলে মসজিদের দায়িত্ব পালন শেষে প্রয়োজনের তাগিদে তাঁকে নওয়াপাড়া বাজারে মানুষের কাছে সহায়তা চাইতে হয়।
আরও পড়ুন: গাজীপুরে পোশাক শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও কারখানা খোলার দাবিতে বিক্ষোভ
এটি তাঁর কাছে আনন্দের বিষয় নয়। বরং প্রয়োজনের কাছে আত্মসমর্পণের মতো মনে হয়। কারও কাছে কিছু চাইতে তাঁরও নিশ্চয়ই কষ্ট হয়। কিন্তু পেটের দায়, সংসারের প্রয়োজন এবং সীমাবদ্ধ জীবনযাপন তাঁকে সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।
দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে আকবর আলীর আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। প্রতিদিন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ান তিনি। অন্যের জীবনে আলোর পথ দেখানোর দায়িত্ব পালন করলেও নিজের জীবনের অভাবের অন্ধকার কাটাতে পারছেন না।
চেঙ্গুটিয়া বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক বদরুল আলম বলেন, “আকবর আলী দীর্ঘদিন ধরে ইমামতি করছেন। তাঁর অবস্থা খুবই কষ্টের। মাত্র ২ হাজার টাকা সম্মানী দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব নয়। প্রয়োজনের কারণেই তাঁকে মানুষের সহায়তা নিতে হয়।”
কলেজ শিক্ষক আবুল হোসেন বলেন, আকবর আলীর জীবন অনেকটা পরিচিত। তাঁকে কেউ করুণার চোখে দেখতে চান না। বরং তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করা এই মানুষটির জন্য এমন একটি ব্যবস্থা হওয়া প্রয়োজন, যাতে তাঁকে সংসারের খরচ জোগাতে মানুষের কাছে যেতে না হয়।
আরও পড়ুন: চরকাউয়ায় সুদ ও তাবিজ বিতর্কে মসজিদের ইমাম: পরিবর্তনের দাবি
আকবর আলীর কষ্টের জায়গাটা এখানেই—তিনি কাজ করতে চান, দায়িত্ব পালন করতে চান, নিজের সম্মান নিয়েই স্ত্রীকে নিয়ে বাঁচতে চান। কিন্তু জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা এবং সামান্য সম্মানীর কারণে তাঁর সেই পথটি কঠিন হয়ে উঠেছে।
তাঁর জীবনের এই গল্প তাই করুণার নয়, দায়িত্ববোধেরও। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এবং মসজিদ কর্তৃপক্ষ সম্মিলিতভাবে পাশে দাঁড়ালে হয়তো তাঁর জীবনের এই অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমতে পারে। মানুষের কাছে সহায়তার জন্য হাত বাড়ানোর বদলে ইমাম আকবর আলী যেন নিজের দায়িত্ব পালন করেই স্ত্রীকে নিয়ে একটু স্বস্তি ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারেন—এটাই হতে পারে তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় সহমর্মিতা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন