০৪:৪২ পি.এম
ভারতে ২০২৫ সালের জুনে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে এর বাস্তবায়ন নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। প্রক্রিয়াটি কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং কত দ্রুত তা বাস্তবায়িত হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রায় দুই সপ্তাহ আগে বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী কিছু সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছেন।
ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন আনা এবং ভোটার তালিকা থেকে কিছু নাম বাদ দেওয়ার মতো বিষয়েও তারা আপত্তি নথিভুক্ত করেন। সোমবার (৫ অক্টোবর) মামলার শুনানিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত জানান, ভোটার তালিকার সংশোধনে ব্যবহৃত ফর্ম ৬-এ কোনো পরিবর্তন অনুমোদন করেনি সুপ্রিম কোর্ট।
আরও পড়ুন: ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেসম্যানের হিন্দুত্ববাদের ‘দ্ব্যর্থহীন নিন্দা’
ভারতে এসআইআর নিয়ে চলমান বিরোধ এখন আইনি লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বরখাস্তের দাবিতে একটি আবেদন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি চলছে। তবে ফর্ম ৬ কী এবং এটি নিয়ে বিরোধের কারণ কী, তা নিয়ে অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা নেই। এসআইআর প্রক্রিয়া ও ফর্ম ৬ ঘিরে পুরো বিষয়টি কী, তা সহজভাবে তুলে ধরা হলো পাঠকের জন্য।
ফর্ম ৬ কী?
ফর্ম ৬ হলো ভারতের নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের আবেদনপত্র। যারা ভোটার তালিকায় নতুন করে নাম তুলতে চান, তারা এই ফর্ম ব্যবহার করেন। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর আবার নাম অন্তর্ভুক্ত করতেও এই ফর্মে আবেদন করা যায়।
ফর্ম ৬-এ আবেদনকারীর নাম, বয়স, ঠিকানা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য দিতে হয়। পাশাপাশি নিজের বসবাসের ঠিকানা ও নাগরিকত্বের বিষয়ে তথ্য এবং অন্য কোনো জায়গার ভোটার তালিকায় আগে থেকেই নাম আছে কি না, সে বিষয়েও ঘোষণা দিতে হয়।
আরও পড়ুন: শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন নতুন কমিটিতে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পেলেন
এই ফর্ম ৬ নিয়ে বিতর্কটা কী?
অনলাইন নিবন্ধনের সময় একটি অতিরিক্ত ঘোষণার প্রয়োজন হওয়ায় এই ‘ফর্ম ৬’ নিয়ে একটি বিতর্ক শুরু হয়েছে। জুলাই মাসে প্রকাশিত নতুন ফর্ম ৬-এ আবেদনকারীদের তিনটি বিবৃতির মধ্যে থেকে একটি বেছে নিতে বলা হয়েছে-
১) ২০০০-এর দশকের শুরুতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ এসআইআর-এর সময় তাদের নাম ভোটার তালিকায় ছিল কি না।
২) সেই তালিকায় তাদের বাবা-মা বা দাদা-দাদি/নানা-নানির নাম ছিল কি না।
আরও পড়ুন: অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পেলেন নতুন দায়িত্ব
৩) সেই তালিকায় তাদের নিজেদের বা তাদের বাবা-মায়ের নাম ছিল কি না।
নতুন এই ঘোষণাটি ফর্মে বাধ্যতামূলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে এটি পূরণ না করলে অনলাইনে ফর্ম জমা দেওয়া যায় না। নির্দেশিকায় আরো বলা হয়েছে, এই ঘোষণায় মিথ্যা তথ্য দিলে ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩১ ধারায় শাস্তি হতে পারে।
ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন নিয়ে কেন বিতর্ক?
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফর্ম ৬-এ নতুন একটি ঘোষণা যোগ করা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাদের মতে, নিয়মে প্রয়োজনীয় সংশোধন না করে ফর্মে এ ধরনের পরিবর্তন আনা যায় না।
আরও পড়ুন: ৭ শর্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের পারমাণবিক প্রস্তাব পাঠানো
ভারতের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ২৮ ধারা অনুযায়ী, নির্বাচনী ফর্মসংক্রান্ত নিয়ম পরিবর্তনের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের। এ জন্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করে সরকারি গেজেটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হয়। ফর্ম ৬ যেহেতু ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধনসংক্রান্ত বিধির অংশ, তাই এতে পরিবর্তন আনতে নিয়ম সংশোধনের প্রয়োজন হয়।
তবে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফর্ম ৬-এ নতুন ঘোষণা যোগ করার সময় এ ধরনের কোনো সংশোধনী বা গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়নি। এ কারণে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু পরিবর্তনটিকে ‘অননুমোদিত’ ও ‘অবৈধ’ বলে আপত্তি জানান এবং তা দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার কথা বলেন।
নতুন ঘোষণায় আবেদনকারীর নিজের বা তাঁর বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদির নাম আগের এসআইআর-এর ভোটার তালিকায় ছিল কি না, তা জানতে চাওয়া হচ্ছিল। থাকলে সংশ্লিষ্ট বিধানসভা, বুথ ও ক্রমিক নম্বরের তথ্যও দিতে বলা হয়।
বিরোধীদের অভিযোগ, এই অতিরিক্ত তথ্য চাওয়ার কারণে বিশেষ করে প্রথমবারের ভোটারদের জন্য ভোটার তালিকায় নাম তোলার প্রক্রিয়া আরো কঠিন হতে পারে। তবে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান ও আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: অমাবস্যার অন্ধকারে ইরানে হামলার পরিকল্পনা ট্রাম্পের
ফর্ম ৬-এর নতুন ঘোষণা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য
নতুন এই ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে নির্বাচন কমিশন অনলাইন ফর্ম ৬ থেকে এটি সরিয়ে দেয়। যেসব রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, সেখানে ঘোষণাটি আর রাখা হয়নি। তবে যেসব রাজ্যে এসআইআর এখনো চলছে, সেসব জায়গায় এটি অনলাইন ফর্মে ছিল।
২৬ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে নির্বাচন কমিশন জানায়, এসআইআর-এর সময় ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যুক্ত করা এই ঘোষণাকে সুপ্রিম কোর্টের মে মাসের রায়ে সমর্থন করা হয়েছে। কমিশন আরো জানায়, এসআইআর শেষ হলে ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধি অনুযায়ী আগের ফর্মই ব্যবহার করা হবে।
তবে পরে বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্ন ওঠে। ৫ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত স্পষ্ট করে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট ফর্ম ৬-এর এই পরিবর্তন অনুমোদন করেনি। আদালত এখন নির্বাচন কমিশনের নথি দেখে জানতে চায়, ফর্মে কী পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং তা কে করেছিলেন।
আরও পড়ুন: টেকনাফে সেনাসদস্য নিহত হওয়ায় নেজামে ইসলাম পার্টির শোক
অর্থাৎ, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ছিল, এসআইআর-এর জন্য যুক্ত করা ঘোষণাটি আদালতের রায়ে সমর্থিত। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই নির্দিষ্ট পরিবর্তনকে আদালত অনুমোদন করেনি। এ নিয়েই এখন মূল বিতর্ক।
ফর্ম ৬ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট কী বলেছে?
ফর্ম ৬-এ নতুন ঘোষণা যুক্ত করা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সোমবার (৫ অক্টোবর) বিষয়টি পরিষ্কার করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন, ফর্ম ৬-এর কোনো পরিবর্তন আদালত অনুমোদন করেনি।
তিনি বলেন, ‘কোনো পরিবর্তিত ফর্ম ৬ আমাদের দ্বারা অনুমোদিত হয়নি। বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। নথি আদালতে জমা পড়লে আমরা দেখব, কে এটি পরিবর্তন করেছে।’ সুপ্রিম কোর্টের এই বক্তব্যের পর নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকেও কমিশনের সমালোচনা আরো জোরালো হয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার একতরফাভাবে ফর্ম ৬ পরিবর্তন করেছেন। তার দাবি, এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন তাদের অবস্থানে অটল রয়েছে।
কমিশনের এক ‘ফ্যাক্ট চেক’-এ বলা হয়েছে, বিহারের এসআইআর-সংক্রান্ত আদেশ কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে জারি করা হয়েছিল এবং ২৭ মে ২০২৬ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট তা বহাল রেখেছে। কমিশন আরো দাবি করেছে, এসআইআরের সময় ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যে ঘোষণা যুক্ত করা হয়েছিল, সেটিও সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বহাল রাখা হয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন