০৩:০৮ পি.এম
একবিংশ শতাব্দীর ভূ-অর্থনৈতিক মেরূকরণ আর আটলান্টিকের তীরে সীমাবদ্ধ নেই; বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির মূল কেন্দ্র শক্তভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের জলরাশিতে আবর্তিত হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক আধিপত্যের যে মিথ কয়েক শতাব্দী ধরে বিশ্বকে শাসন করে এসেছে, তা আজ অনেকটাই অস্তমিত। একটি জাতির অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড় করানোর জন্য ইউরোপ বা আমেরিকার দিকে তাকিয়ে থাকার আর কোনো যৌক্তিকতা নেই। বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য ভ্রান্ত আভিজাত্যের খোলস ছেড়ে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। আমাদের সামনে এখন একটি সুস্পষ্ট পথ খোলা— আর তা হলো 'Look East Policy' বা পূর্বমুখী নীতি। ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এই বাস্তবতায় চীন আমাদের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র; আগামী দিনের সবচেয়ে বড় কৌশলগত অংশীদার এবং সার্বিক উন্নয়নের চূড়ান্ত 'রোল মডেল' হওয়ার যোগ্যতা রাখে একমাত্র চীন।
পশ্চিমা বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা ও জীবনযাত্রার প্রতি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি মোহ, সামষ্টিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে চরম অলাভজনক। পরিসংখ্যান বলছে, ইউরোপীয় অর্থনীতি বর্তমানে একটি দীর্ঘস্থায়ী মন্থরতা ও স্থবিরতার (Stagnation) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নরওয়ে, সুইডেন বা সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের কার্যত কোনো কৌশলগত বা গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক নেই। আমাদের দেশের সবচেয়ে মেধাবী অংশটি পশ্চিমা দেশগুলোতে পড়তে যায় এবং সেখানকার স্থায়ী নাগরিকত্ব গ্রহণ করে। এই মেধাপাচার (Brain Drain) যার রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (ROI) বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য শূন্য। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য আমাদের রেমিট্যান্সের বড় উৎস হলেও সেখানে জ্ঞানভিত্তিক বা প্রযুক্তি-নির্ভর অর্থনীতির কোনো ভিত্তি তৈরি হচ্ছে না।
ঠিক এই শূন্যস্থানে চীন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। গত এক দশকে চীনের শিক্ষাব্যবস্থায় যে অবিশ্বাস্য বিপ্লব ঘটেছে, তা পশ্চিমাদের আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে। 'টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৪'-এর শীর্ষ ৫০-এ চীনের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান প্রমাণ করে যে তাদের শিক্ষা এখন কতটা বিশ্বমানের। চীনের শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত বাস্তবমুখী, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং ফলিত বিজ্ঞানভিত্তিক। চীন প্রতি বছর প্রায় ৪০ লাখেরও বেশি স্টেম (STEM- বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে। আমাদের যে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী এখন চীনে যাচ্ছে, তারা শুধু ডিগ্রি নিয়েই ফিরছে না; তারা চীনের আধুনিক প্রযুক্তি, Supply Chain Management এবং শৃঙ্খলিত কর্মবোধ আয়ত্ত করছে। পশ্চিমা বিশ্বে পড়াশোনা করতে যাওয়া তরুণদের মত চিরতরে চলে যাচ্ছে না; বরং তারা দেশে ফিরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিটুবি (B2B) নেটওয়ার্ক এবং চীনা মেগাপ্রকল্পগুলোতে যুক্ত হয়ে 'Brain Circulation'-এ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। সহজ ও সাবলীল ভিসা নীতি এবং বাংলাদেশের প্রতি চীনের ইতিবাচক মনোভাব আজ চীনকে আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য আদর্শ গন্তব্যে পরিণত করেছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-জাপান চুক্তি: ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হবে পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মসংস্থান চুক্তি
ইতোমধ্যে মেগা প্রজেক্ট, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, কৃষি প্রযুক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাতে চীনের সাথে বাংলাদেশের গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে উঠেছে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের পরীক্ষিত সহায়তার পাশাপাশি তাদের বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা আমাদের জন্য ঐতিহাসিক 'সুযোগের জানালা' (Window of Opportunity) খুলে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদ কানামে আকামাতসুর 'ফ্লাইং গিজ' (Flying Geese) তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি দেশ যখন অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হয়, তখন তারা শ্রমঘন শিল্প ছেড়ে উচ্চ প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হয়। চীন ঠিক এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং বেসিক ম্যানুফ্যাকচারিং ছেড়ে ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল ও উচ্চ মূল্য সংযোজিত পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। চীনের ছেড়ে দেওয়া এই বিশাল বেসিক ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সাপ্লাই চেইনের শূন্যস্থানে বাংলাদেশ অনায়াসেই জায়গা করে নিতে পারে। সার্বিক এই পার্টনারশিপ ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের সমীকরণই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ নিশ্চিন্তে চীনকে তার উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে নিতে পারে। আমরা যদি চীনা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে আন্তঃদেশীয় পাইকারি বাণিজ্যের (Wholesale agency) শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক লজিস্টিকস ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারি, তবে এটি আমাদের নতুন উদ্যোক্তা তৈরির এক বিশাল হাব হিসেবে কাজ করবে। আমাদের ২ থেকে ৫ কোটি শিক্ষিত তরুণ শ্রমশক্তি সরাসরি এই বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে যুক্ত হয়ে দেশের কর্মসংস্থানের চিত্র পুরোপুরি বদলে দিতে সক্ষম।
চীনের ঠিক পাশেই থাকা ভিয়েতনামের দিকে তাকালে আমরা এর প্রমাণ দেখতে পাই। মাত্র এক দশকের ব্যবধানে ভিয়েতনাম আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে, যা আমাদের ৪৫ বছরের দীর্ঘ যাত্রাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এর মূল কারণ হলো ভিয়েতনামের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং তাদের নাগরিকদের কঠোর শৃঙ্খলাবোধ। ভিয়েতনামিরা অত্যন্ত কর্মঠ এবং তারা খুব দ্রুত পশ্চিমা ও চীনা বিনিয়োগ নিজেদের দেশে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজ বলেছেন, “উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং সফল রূপান্তরের একটি পরীক্ষিত মডেল প্রয়োজন।” আর ঠিক এই বাস্তবতায় ব্যবসা-বাণিজ্য, জয়েন্ট ভেঞ্চার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্পায়ন—সব ক্ষেত্রেই আমাদের চীনের সাথে যৌথ বিনিয়োগ ও সমন্বয়ের দিকে যেতে হবে। হাজারো চীনা উদ্যোক্তা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। তাদের আকৃষ্ট করতে হলে কার্যকর 'One Stop Solution' নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুন: হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার শিকার প্রতিমন্ত্রী ইশরাক
বিশ্ব অর্থনীতির এই পালাবদলের দিনে টিকে থাকতে হলে আমাদের প্রয়োজন নির্মোহ বাস্তববাদ। ইউরোপ-আমেরিকার দিকে তাকিয়ে অলীক স্বপ্ন দেখার দিন শেষ হয়ে গেছে; এখন 'Look East Policy'-কে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির মূলভিত্তি করতে হবে। চীনের বাস্তবমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, অপ্রতিরোধ্য বাণিজ্য নীতি ও অদম্য কর্মস্পৃহা হতে পারে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন ব্লু-প্রিন্ট। শিক্ষা, শিল্প ও বাণিজ্যে চীনের সাথে নিবিড় অংশীদারিত্বের বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের বর্তমান উপলব্ধি তাই অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। চীনের এই পরীক্ষিত কাঠামোকে পুঁজি করেই রচিত হোক আমাদের স্বনির্ভরতার নতুন ইতিহাস। আর এই পথ ধরেই এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী উৎপাদনমুখী অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করুক বাংলাদেশ।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও উদ্যোক্তা; পরিচালক, ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (IBA), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন