১১:৪১ এম
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের সেরা গণিতবিদদের ভাবিয়ে তোলা দুটি জটিল সমস্যার সমাধান করে ইতিহাস গড়েছেন দুই চীনা গবেষক। তারা এই কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন গণিতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সম্মান ফিল্ডস মেডেল। এবারে চীনের দুই গণিতবিদ এই পুরস্কার অর্জন করেছেন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ফিল্ডস মেডেল যৌথভাবে পেয়েছেন চীনের হং ওয়াং ও ইউ ডেং, যুক্তরাষ্ট্রের জন পারডন এবং কানাডার জ্যাকব সিমারম্যান। বিজয়ীদের প্রত্যেকে পেয়েছেন ১৫ হাজার কানাডিয়ান ডলার (প্রায় ১০ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার বা ৮ হাজার পাউন্ড)।
হং ওয়াং ও ইউ ডেং এমন দুটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান করেছেন, যেগুলোর উত্তর খুঁজতে বিশ্বের গণিতবিদরা শত বছরেরও বেশি সময় ধরে চেষ্টা করে আসছিলেন। ৩৫ বছর বয়সী হং ওয়াং এই সম্মান পাওয়া ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় নারী।
আরও পড়ুন: ঢামেকে অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটে মরদেহ পরিবহনে বিপাকে স্বজনরা, রোগীরাও ভোগান্তিতে
গণিতের নোবেল পুরস্কার হিসেবে পরিচিত ফিল্ডস মেডেল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে এক অনুষ্ঠানে প্রদান করা হয়। এমন এক সময়ে এই পুরস্কার দেওয়া হলো, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের গণনাভিত্তিক কাজকে নতুনভাবে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
এই অর্জনের খবর প্রকাশ করার পর চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়। উইবো থেকে রেডনোট—বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ‘ফিল্ডস মেডেল’ এবং ‘প্রথম চীনা গণিতবিদ হিসেবে ফিল্ডস মেডেল জয়’ হ্যাশট্যাগে কয়েক মিলিয়ন ভিউ হয়েছে।
উইবোর এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘এটি সব চীনা মানুষের গর্ব।’ আরেকজন মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা ইতিহাসের সাক্ষী হচ্ছি।’
চীনের সংবাদমাধ্যমগুলোও দুই গণিতবিদকে নিয়ে বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে তাদের শিক্ষাজীবন, গবেষণার পথচলা, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং এই অর্জনের জাতীয় গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ইসরাইলের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৭৭.৭ শতাংশ, ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ
ফিল্ডস মেডেলজয়ী প্রথম জাতিগত চীনা গণিতবিদ শিং-তুং ইয়াও বলেছেন, ‘চীনের গণিত সম্প্রদায়ের জন্য এটি এমন একটি স্বপ্ন, যা আমরা কয়েক দশক ধরে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় ছিলাম।’
হং ওয়াং তার সহকর্মী জশ জাহলের সঙ্গে মিলে ১৯১৭ সালে জাপানি গণিতবিদ সোইচি কাকেয়া উত্থাপিত একটি বিখ্যাত সমস্যার সমাধান করেন। সমস্যা ছিল—একটি পেন্সিলকে সম্পূর্ণ একবার ঘোরাতে হলে সেটি সর্বনিম্ন কতটুকু ক্ষেত্রফল অতিক্রম করবে?
ওয়াং ও জাহল সমস্যাটি বিশ্লেষণ করেন এই ধারণার ভিত্তিতে যে পেন্সিলটি সমতল পৃষ্ঠে নয়, বরং ত্রিমাত্রিক মহাকাশে ভাসছে। দীর্ঘ গবেষণার পর তারা গত বছর এ বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।
এএফপি সংবাদ সংস্থাকে হং ওয়াং বলেন, ‘এই অনুমানটি মানুষকে এত আকৃষ্ট করে, কারণ একই ধরনের ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের সমস্যাতেও স্বাভাবিকভাবে দেখা যায়।’
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
অন্যদিকে, ৩৭ বছর বয়সী ইউ ডেংকে সম্মানিত করা হয়েছে আরও একটি শতবর্ষের পুরোনো গাণিতিক সমস্যার সমাধানের জন্য।
১৯০০ সালে জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট এমন একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন, যা পরে ‘হিলবার্টের ষষ্ঠ সমস্যা’ নামে পরিচিত হয়। প্রশ্নটি ছিল—অসংখ্য পৃথক কণার গতিবিধি থেকে কীভাবে একটি সামগ্রিক ব্যবস্থার আচরণ নির্ণয় করা যায়।
ইউ ডেং গ্যাসের আচরণ বিশ্লেষণ করে এই জটিল সমস্যার সমাধান করেন। এই অর্জনের অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেসব মহান গণিতবিদকে আমি সবসময় শ্রদ্ধা করেছি, তাদের নামের পাশে নিজের নাম যুক্ত হওয়া সত্যিই বিশাল সম্মানের।’
হং ওয়াং মূলত হারমোনিক অ্যানালাইসিস নিয়ে গবেষণা করেন। গণিতের এই শাখায় তরঙ্গের গতি, আচরণ এবং বিভিন্ন ধরনের কম্পন বিশ্লেষণ করা হয়।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
প্রতি চার বছর পরপর ৪০ বছরের কম বয়সী অসাধারণ গণিতবিদদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ফিল্ডস মেডেল। তাই এটিকে তরুণ গণিতবিদদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
হং ওয়াং ১৯৯১ সালে চীনের দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন নগরী গুইলিনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় দুটি শ্রেণি একসঙ্গে অতিক্রম করেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে, ২০০৭ সালে তিনি চীনের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
শুরুতে তিনি ভূবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেও এক বছর পর গণিত বিভাগে চলে যান। স্নাতক সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার জন্য ফ্রান্সে পাড়ি জমান। সেখানে প্যারিস-সুদ বিশ্ববিদ্যালয় ও একোল পলিটেকনিকে পড়াশোনা করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট অব হায়ার সায়েন্টিফিক স্টাডিজের (আইএইচইএস) স্থায়ী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
বৃহস্পতিবার রাতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ফোন করে তাকে অভিনন্দন জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ম্যাক্রোঁ লেখেন, ‘তিনি আমাদের গবেষণা ও শিক্ষাব্যবস্থার উৎকর্ষের প্রতীক। বিজ্ঞানের জন্য ফ্রান্সকে বেছে নিন।’
অন্যদিকে, ইউ ডেং ছোটোবেলা থেকেই গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিতেন। তিনিও ২০০৭ সালে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে ২০০৯ সালে এমআইটিতে চলে যান। পরে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ২০২৪ সাল থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন