১১:৪৭ এম
ভারতের মুম্বাইয়ের ২৭ বছর বয়সী মডেল ও থিয়েটার শিল্পী রিয়া আহির বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। শিক্ষাব্যবস্থার নানা অনিয়মের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ যখন কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আটক করে, তখন তাদের মুক্তির দাবিতে তিনি নিদ্বির্ধায় পুলিশের ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে যান।
সেই সাহসী অবস্থানের দৃশ্য যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন নেটিজেনরা তাকে ‘সাহসী’ ও অকুতোভয় বলে আখ্যা দিয়ে প্রশংসা করতে শুরু করেন। সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে রিয়া জানান, তার বাবা-মা এই সাহসিকতায় খুবই খুশি হয়েছেন এবং তাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন।
মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে জাতীয় মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার (NEET) প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে পুলিশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে জোরপূর্বক তাদের পুলিশের ভ্যানে তোলে, যার মধ্যে মহিলা আন্দোলনকারীরাও ছিল।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
রিয়া আহির জানান, আটক হওয়া ব্যক্তিদের সাথে তার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। কিন্তু যেভাবে গাদাগাদি করে তাঁদের ভ্যানে তোলা হচ্ছিল, সেটি দেখে নাগরিক দায়বদ্ধতার কারণে তিনি চুপ থাকতে পারেননি। তিনি বলেন, “ভ্যানে অনেককে তুলে দেওয়া দেখে আমি একজন নারীকে নামিয়ে আনার চেষ্টা করি, কিন্তু পুলিশ বাধা দেয়।”
শেষ পর্যন্ত উপায় না দেখে তিনি চলন্ত ভ্যানের ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়ান এবং আটক হওয়া সকলের মুক্তির দাবি করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, রিয়া অবিচলভাবে পুলিশের ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এবং সেখান থেকে সরে যেতে স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। রিয়ার অভিযোগ, তাকে ভয় দেখিয়ে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ভ্যানচালক বেশ কয়েকবার জোরে ইঞ্জিন চালিয়ে গাড়ি সামনে নেওয়ার ভয় দেখান, কিন্তু তিনি এক চুলও নড়েননি।
রিয়ার এই অদম্য অবস্থান দেখে অন্যান্য আন্দোলনকারীরাও তার পাশে এসে কাঁধ মেলান। তীব্র প্রতিবাদ ও তোপের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত পুলিশ আটক ব্যক্তিদের শিবাজি পার্কে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
রিয়া জানান, এটিই ছিল তার জীবনের প্রথম কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার অভিজ্ঞতা। তিনি ২১ জুলাই প্রথমবার শিবাজি পার্কে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই পুলিশ অনেককে আটক করে নেয়। ফলে ২২ জুলাই তিনি আবার সেখানে যান এবং সেদিনই ঘটে যায় সেই অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত, যা তাকে পরিচিত মুখ বানিয়ে তোলে।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
রিয়া বলেন, আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার কোনো পরিকল্পনা তার ছিল না; পুলিশি পদক্ষেপের মুখোমুখি হয়ে সেই মুহূর্তে নিজের বিবেকের তাড়না থেকেই সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন। এমন বিপদের মুখেও সাহসের পরিচয় দেওয়ার প্রসঙ্গে রিয়া জানান, তার পরিবারের সঙ্গে ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর দীর্ঘ ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তার বাবা ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশে (ITBP) দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যও প্রতিরক্ষাবাহিনীতে রয়েছেন। মুচকি হেসে রিয়া বলেন, “এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস হয়তো আমার রক্তেই প্রবাহিত হচ্ছিল।”
রিয়া মনে করেন, এই সংগ্রাম কেবল প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে নয়, বরং গোটা শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কারের পক্ষে। তিনি মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছেন, কিন্তু পেশাগত ব্যস্ততার জন্য গ্র্যাজুয়েশন শেষ করতে পারেননি। বর্তমানে তিনি মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করছেন।
নিজের পড়াশোনার অভিজ্ঞতা থেকে অভিযোগ করে রিয়া বলেন, নিয়মিত কোর্স ফি পরিশোধ করার পরেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম প্রশাসনিক সহায়তা পাওয়া যায় না এবং সরকারি যোগাযোগের নম্বরগুলোতেও কেউ সাড়া দেয় না। তার ভাষায়, এটি শুধু বিশেষ একটি পরীক্ষার বিষয় নয়, পুরো ব্যবস্থার যে গলদ আছে—এ আন্দোলন সেই গলদর বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত প্রতিবাদ।
প্রতিবাদের মুখ হয়ে ওঠার পাশাপাশি, পেশাগত জীবনে রিয়া আহির প্রায় ১৩ বছর ধরে নিয়মিত হিন্দি থিয়েটারে যুক্ত রয়েছেন এবং দাপটের সঙ্গে মডেলিং করছেন। এর বাইরে, গত বছর তিনি তার নিজস্ব উদ্যোগ ‘রিয়াসত’ চালু করেন, যার মূল কাজ হলো স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পীদের তৈরি পণ্য সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড প্রাডার কোলহাপুরি চপ্পলের নকশা বিতর্কের পর, দেশের প্রান্তিক কারিগরদের কাজকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার ভাবনা থেকেই এই সামাজিক উদ্যোগের জন্ম দেন তিনি।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন