০৩:৩৩ পি.এম
জার্মানির স্টুটগার্ট শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবদুল আহাদ মোমান্ড শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তিনি ছিলেন মহাকাশে প্রথম কোরআন তিলাওয়াতকারী আফগান নভোচারী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ক্যানসার রোগের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ৬৭ বছর ছিল। তাঁর এই প্রয়াণে বিশ্বজুড়ে মহাকাশপ্রেমী এবং আফগান সম্প্রদায়ের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আবদুল আহাদ মোমান্ডের জন্ম ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি আফগানিস্তানের গজনি প্রদেশে হয়েছিল। তরুণ বয়সে তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে সামরিক বিমান চালনার ওপর উচ্চতর শিক্ষা ও নিবিড় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে তিনি আফগান বিমানবাহিনীতে যুদ্ধবিমানচালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং দ্রুতই পাইলট হিসেবে মেধা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে সুনাম অর্জন করেন।
১৯৮৮ সালটি তাঁর জীবনের এবং সমগ্র আফগানিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে পরিচিত। ওই বছরের ২৯ আগস্ট, সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘সয়ুজ টিএম-৬’ মহাকাশযানে চড়ে তিনি পৃথিবীর কক্ষপথে রওনা দেন। এই অভিযানের মাধ্যমে তিনি বিশ্বের দরবারে প্রথম আফগান মহাকাশচারী হিসেবে একটি স্বর্ণাক্ষরে নিজের নাম লিখে রাখেন। মহাকাশে অবস্থানকালে, তিনি ‘মীর স্পেস স্টেশনে’ কাটান। সেখানে নয় দিন পরে, ৭ সেপ্টেম্বর, সফলভাবে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর এই ঐতিহাসিক মহাকাশযাত্রা কেবল আফগানিস্তানের জন্যই নয়, বরং তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের জন্যও ছিল বিশাল গৌরবের বিষয়।
আরও পড়ুন: মিশিগানে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে প্রতিবেশীদের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন
মহাকাশ অভিযানের সময়, আবদুল আহাদ মোমান্ড অনেক অনন্য কর্মকাণ্ড ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। তিনি গভীর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে মহাকাশে নিজের সঙ্গে পবিত্র কোরআনের একটি কপি নিয়ে গিয়েছিলেন। মহাকাশ স্টেশন থেকে তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে কোরআন তিলাওয়াত করার গৌরব অর্জন করেন। একই সঙ্গে, মহাকাশ থেকে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নিজের মাতৃভাষা পশতুতে কথা বলে অনন্য একটি রেকর্ড তৈরি করেন, যা আফগান সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী বার্তা বিশ্বজুড়ে পৌঁছে দেয়। মহাকাশে অবস্থানকালে তিনি আফগানিস্তানের ভূপ্রাকৃতিক ও পরিবেশগত ছবি তোলেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অংশ নেন।
তৎকালীন ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে, তাঁর এই অভিযানের গুরুত্ব ছিল অপারিসীম। ১৯৮৮ সালে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারের চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক সেই মুহূর্তে, মোমান্ডের এই মহাকাশযাত্রাকে দুই দেশের মধ্যে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এই ঘটনাটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের সম্ভাবনাকে তুলে ধরে।
তবে সময়ের পরিক্রমায়, আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং গৃহযুদ্ধের কারণে এই মহানায়কের অবদান অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। নব্বইয়ের দশকে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তিনি সপরিবারে জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে বাধ্য হন এবং জীবনের বাকি সময় প্রবাসেই কাটান। বর্তমানে তালেবানশাসিত আফগানিস্তানে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের প্রথম এই মহাকাশচারীর ঐতিহাসিক অর্জন রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ স্মরণ বা আলোচনা করা হচ্ছে না।
রাজনৈতিক পটভূমি যাই হোক না কেন, আবদুল আহাদ মোমান্ডের নাম আফগান জাতির ইতিহাসে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং মহাকাশ অভিযানের অমূল্য একটি নক্ষত্র হয়ে থাকবে। প্রতিকূলতার মাঝে আকাশ ছোঁয়ার যেটুকু স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন, তা আগামী প্রজন্মের আফগান তরুণদের জন্য সবসময় অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে।
আরও পড়ুন: ১০ বছর পর মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে বের হতে পারবে সদস্য দেশগুলো
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন