০১:০৬ পি.এম
পরিবেশ অধিদপ্তর সুন্দরবন সংলগ্ন গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন পর্যটন কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। খুলনার দাকোপে অধিদপ্তরের অনুমোদনহীন ১৮টি রিসোর্ট ও ইকো কটেজের কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গত রবিবার (৪ অক্টোবর) পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের লিখিতভাবে এই নির্দেশনা প্রদান করেন। পাশাপাশি, নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এসব অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্দেশনা অমান্য করলে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, নিয়মিত মামলা এবং অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: প্রদীপের আলোয় আলোকিত এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বরিশালের কাউনিয়া মহাশ্মশান
১৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০টিকে ৩০ দিনের মধ্যে এবং ৮টিকে ১৫ দিনের মধ্যে তাদের স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে চিঠিতে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ জানান, সুন্দরবনসংলগ্ন দাকোপ এলাকায় গড়ে ওঠা পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অধিকাংশই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রহীন। তিনি বলেন, "ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও সংশ্লিষ্টরা তা নেননি। এ কারণেই বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "সুন্দরবনের ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) এলাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সুযোগ নেই। ইসিএ বিধিমালায় সেখানে বেশকিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সেসব মানছে কিনা, তা পরিবেশ অধিদপ্তর পর্যবেক্ষণ করবে।"
হারুন-অর-রশীদ জানান, খুলনা অংশে ১৮টি অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে চালু হয়েছে, আবার কিছু নির্মীয়মাণ অবস্থায় রয়েছে। বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অংশেও এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। পুরো সুন্দরবন এলাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিভাগীয় কার্যালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে।
আরও পড়ুন: কক্সবাজার সাংবাদিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি আশেক উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান
তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রিসোর্ট মালিকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া শাওন জানান, তাঁরা এখনও পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো চিঠি পাননি। তিনি বলেন, "জাতীয় পর্যটন নীতিমালা-২০১০-এ সুন্দরবনসহ দেশের সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকাগুলোতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে টেকসই ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় পর্যটন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব পর্যটন উন্নয়নের কথাও নীতিমালায় রয়েছে।
তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হারুন-অর-রশীদের বক্তব্য, জাতীয় পর্যটন নীতিমালায় পর্যটন উন্নয়নের কথা থাকলেও পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরের এখতিয়ার। তিনি বলেন, "পরিবেশের নিয়ম না মানলে অধিদপ্তর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। সুন্দরবনসংলগ্ন রিসোর্টগুলোর ক্ষেত্রে সেটিই করা হয়েছে।"
এদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তরের নথিতে খুলনা অংশে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হলেও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বাস্তবে কার্যকর রিসোর্টের সংখ্যা ১৫টি। কেওড়াবন, লা সিলভা ও অরণ্যছায়া নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শুধু সাইনবোর্ড রয়েছে- এমন দাবিও পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন: ফটিকছড়িতে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে যুবক জিসান নিহত, আহত ৪
অধিদপ্তরের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে অরণ্যছায়া, অরণ্যবাড়ী, কেওড়াবন, মায়াবন, গহন, দ্য ফরেস্ট রিট্রিট, নিকুঞ্জ ভ্যালি, লা সিলভা কটেজ, বনবিবি, সুন্দরী, ইরাবতী, বনমালী, গোলকানন, পিয়ালী, ম্যানগ্রোভ, জঙ্গলবাড়ী, বনবাস ও বনলতা ইকো কটেজ।
ফলে প্রশ্ন উঠছে- কোনগুলো বাস্তবে চালু, কোনগুলো নির্মীয়মাণ এবং কোনগুলো শুধু নাম বা সাইনবোর্ডসর্বস্ব- সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও মাঠপর্যায়ের যাচাই কতটা হয়েছে- তা নিয়ে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসায় রিসোর্ট ও ট্যুর অপারেটরদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। এক পক্ষ পর্যটকদের সুন্দরবনের ভেতর লঞ্চে নিয়ে গিয়ে পর্যটন ব্যবসা পরিচালনা করছে। অন্যদিকে আরেক পক্ষ সুন্দরবনের কাছাকাছি লোকালয়ে রিসোর্ট গড়ে তুলে পর্যটকদের থাকা, খাওয়া ও বিনোদনের ব্যবস্থা করছে।
কিছু ব্যবসায়ী মনে করছেন, পর্যটন বাজারের অংশীদারত্ব নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যবসায়িক টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব পরিবেশগত সিদ্ধান্ত বা প্রশাসনিক তৎপরতার ওপর পড়ছে কিনা- সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: বাকেরগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রম
তবে পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, তাদের অভিযান বা নোটিশের সঙ্গে কোনো ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের সম্পর্ক নেই। ছাড়পত্র না থাকা এবং পরিবেশগত বিধিনিষেধ না মানার অভিযোগের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে রিসোর্ট মালিকদের বক্তব্য, সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। ফলে সরাসরি বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে নিয়ম মেনে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া উচিত।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন