০৫:১৪ পি.এম
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক প্রধান কমান্ডার মোহসেন রেজাইকে দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই কাউন্সিল দেশের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান টানাপোড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষাপটে রেজাই নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দীর্ঘকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে তেহরান হরমুজ প্রণালিকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত করেছে।
রেজাই এখন দায়িত্ব নিয়েছেন এমন সময়ে আলোচনা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল, ইরানের সার্বভৌমত্ব এবং অবরোধ নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।
আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর জন্মদিনে জেরুজালেমে বিক্ষোভ, গাড়িবহরে বোতল নিক্ষেপ
তিনি মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন, যিনি সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এর আগে আলী লারিজানি এই পদে ছিলেন, যিনি মার্চে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন।
মোহসেন রেজাই ৭১ বছর বয়সী, ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি আইআরজিসির প্রধান কমান্ডার ছিলেন। তার নেতৃত্বের সময় ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ, যাকে ইরানে ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা’ বা ‘স্যাক্রেড ডিফেন্স’ নামে অভিহিত করা হয়, বড় একটি অংশজুড়ে ছিল।
আইআরজিসির দীর্ঘদিনের প্রধান হিসেবে রেজাই ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সামরিক দায়িত্বের পর তিনি দেশের রাজনৈতিক এবং নীতিনির্ধারণী কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত হন।
তিনি এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ইরানের পার্লামেন্ট ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে কোনও আইন নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তা নিষ্পত্তিতে এই কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকে।
আরও পড়ুন: কাতালোনিয়ায় ইসলামফোবিয়ার উত্থানে রাজনীতির সমীকরণ বদলে যাচ্ছে
গার্ডিয়ান কাউন্সিল একটি আলাদা সাংবিধানিক সংস্থা, যার সদস্যরা সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ দেন। এই সংস্থা আইনগুলো সংবিধান ও ইসলামি আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পর্যালোচনা করে।
রেজাই দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়।
জুলাইয়ে রেজাই বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ‘ডজনখানেক পারমাণবিক বোমার’ চেয়েও বেশি মূল্যবান। তিনি গত সপ্তাহে মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকলে ওয়াশিংটনকে ‘গুরুতর ঝুঁকি ও হতাহতের’ মুখে পড়তে হবে বলেও সতর্ক করেন।
ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তেহরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও দেশটির বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ জোরদার করেছে।
আরও পড়ুন: আরটিভিতে সংবাদ প্রকাশের পর সোলায়মানের জন্য ৬০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রবিবার সন্ধ্যায় রেজাইকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দেন। একই দিনে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও কাউন্সিলে তার প্রতিনিধি হিসেবে রেজাইকে নিয়োগ দেন।
নিয়োগ আদেশে রেজাইয়ের অভিজ্ঞতা এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা যুগের অগ্রগামীদের’ একজন হিসেবে তার ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়োগের এই ভাষ্য থেকে স্পষ্ট যে, রেজাইয়ের সামরিক অতীত তার নতুন দায়িত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে দেখা হয়েছে।
সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কৌশলগত অবস্থানের সমন্বয় ঘটে এই কাউন্সিলের মাধ্যমে।
আরও পড়ুন: পশ্চিম তীরে বন্দুকযুদ্ধে দুই ফিলিস্তিনি নিহত, আহত ছয় ইসরায়েলি সেনা
কাউন্সিলের প্রধান কে হচ্ছেন, সেটি শুধুমাত্র প্রশাসনিক বিষয় নয়। বিশেষ করে যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনিশ্চিত আলোচনা এবং হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধের সময়ে এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি।
তেহরানভিত্তিক সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক আবাস আসলানি আল-জাজিরাকে বলেন, রেজাই তার সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন দায়িত্বে আসছেন।
আসলানির মতে, নিরাপত্তা ইস্যুতে রেজাই তার পূর্বসূরির তুলনায় খুব বেশি ভিন্ন নন। তবে দেশের অভ্যন্তরে ভারসাম্য রক্ষা এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় তৈরিতে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
যেহেতু সাবেক আইআরজিসি প্রধান এবং এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে রেজাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
আরও পড়ুন: ১ নভেম্বর থেকে ফোনে কলারের নাম-পরিচয় দেখা যাবে
নিয়োগ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মূলত দুটি ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। একটি ব্যাখ্যা হলো- যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র উত্তেজনার মধ্যে ইরান তার নিরাপত্তা ও সামরিক বিবেচনাকে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
অন্য ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সাবেক আইআরজিসি প্রধানকে দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রস্থলে আনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে কোনও সমঝোতা বা চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সেটি কট্টরপন্থী মহলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সহজ হতে পারে।
রেজাইয়ের নিয়োগকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুটি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। প্রথম ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ানোর জবাবে তেহরান আরও কঠোর নিরাপত্তা এবং সামরিক অবস্থান গ্রহণের বার্তা দিচ্ছে।
অন্যদিকে দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি হলো, কঠিন কোনও সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রেজাইকে সামনে আনা হয়ে থাকতে পারে। বড় কোনও সমঝোতাটি সবসময় মধ্যপন্থী ব্যক্তিদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় না।
আরও পড়ুন: তিউনিসিয়ায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, রাজধানী উত্তাল বিক্ষোভে
মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান রাখা ব্যক্তিরা প্রায়ই দেশের অভ্যন্তরে এই ধরনের সমঝোতা গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সক্ষম হন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন