০৯:৩৬ এম
বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় বাজেট ঘোষণা হবে। এটি হবে গত ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট।
সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ মঙ্গলবার বেলা তিনটায় জাতীয় সংসদে এই বাজেট ঘোষণা করবেন। সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস জানিয়েছে, বাজেটের সম্ভাব্য আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।
এটি হবে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট এবং সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের চাপ থেকেই বাজেটের আকার এত বড় হচ্ছে বলে অর্থবিভাগ আভাস দিয়েছে।
আরও পড়ুন: পিরোজপুরে লাশ দাফনে বাধা, নাহিদ ইসলামের নিন্দা ও ইনসাফের আহ্বান
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বাসস জানিয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে, বাজেটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে দেশে উচ্চমূল্যস্ফীতি দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাড়ে সাত শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়াও, বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে পারে।
বাজেটের খসড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সহ তেরটি ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: বিদেশি ঋণ শোধে চাপ বাড়ছে, সহায়তার অর্থছাড় কমেছে
বিশেষ করে বহুল আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করার কথা রয়েছে নতুন বাজেটে।
এদিকে, বিবিএস ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মাথাপিছু আয় ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) যে সাময়িক হিসাব প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় এখন ৩ হাজার ২০ ডলার। এছাড়াও দেশের অর্থনীতির আকার ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
বাজেটে যেসব বিষয়ে প্রাধান্য থাকছে, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, দেশের প্রত্যেক মানুষের কথা মাথায় রেখে এবারের বাজেট দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, প্রতিটি মানুষের কথা মাথায় রেখে বাজেট করার সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে- উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা এবং রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা বাজেটে নির্ধারণ করা হচ্ছে সেটি কীভাবে সফল করা যাবে তা নির্ধারণ করে কার্যকর করা।
আরও পড়ুন: চকরিয়ায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা আকিত হোসেন সজিব গ্রেফতার
এছাড়াও বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের আস্থায় এনে বিনিয়োগ বাড়ানো, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দেওয়াও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই বাজেটে।
আগামী অর্থবছরের জন্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে ভর্তুকির জন্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব অর্থবিভাগে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে ভর্তুকির চাপ আরও বাড়ার আশংকা রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যয়ের অর্থ জোগাতে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআর বহির্ভূত খাত থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর বহির্ভূত রাজস্ব আয়ের খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার মুস্তাফিজুর রহমান জানাচ্ছেন, জিডিপির বৃদ্ধির গতি কমেছে, প্রাইভেট বিনিয়োগ কমেছে, রফতানি প্রবৃদ্ধি মাইনাস দুই শতাংশে নেমে গেছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি ওপেনিং নেতিবাচক হয়েছে- এমন অনেক পুঞ্জিভূত সমস্যার মধ্যে বাজেট ঘোষণা হতে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: আওয়ামী লীগ আখ্যা দিয়ে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সিপিবি কার্যালয়ে হামলা
"এগুলো পুনরুদ্ধার এবং স্থিতিশীলতা অর্জনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসছে। আবার নির্বাচনে বিএনপি অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নিতে হবে এই বাজেটকে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে জনজীবনে স্বস্তি আনতে বিনিয়োগকে চাঙ্গা করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
এবার বাজেটে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হচ্ছে, সেটি চলতি অর্থবছরে যা অর্জিত হয়েছে তার চেয়ে প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। আবার বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রাখা হয়েছে। এটি পূরণের জন্য সরকারকে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হবে।
বাজেটে ব্যাংকিং খাত থেকেই ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে সরকার। "এই রাজস্ব আহরণ কীভাবে করা হবে, সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ হবে। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী ঋণের সুদ এখনেই তো ব্যয়ের শীর্ষে। ফলে পরিকল্পনা অনুযায়ী বিএনপি সরকার রাজস্ব আহরণ না বাড়ালে ঘাটতি বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি ঋণ ঝুঁকিতে পড়বে," বলছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, "উচ্চমূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। সেজন্য উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগকে চাঙ্গা করতে হবে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও স্বকর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। পে স্কেল দেওয়া, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও নতুন উদ্ভাবনী কর্মসূচির মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।"
আরও পড়ুন: দেশ ছাড়ার ঘোষণা দিলেন রুমি, বললেন-‘আপনারা ভালো থাকেন’
"আবার এসব কিছুর জন্য রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। সেটি কী বাড়তি কর আরোপ করে করা হয়, নাকি উদ্ভাবনী ধারণা প্রবর্তন হয়- সেদিকেও সবার দৃষ্টি থাকবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান।
এদিকে এবারের বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে পারে বলে সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস জানায়।
লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার পাশাপাশি 'বাংলাবিজ' নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। অর্থবিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এর মাধ্যমে ব্যবসাসংক্রান্ত সেবাগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রমকে আরও ব্যাপকভাবে অনলাইনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব বাজেটে আসতে পারে। এছাড়াও বাজেটে দেশের ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য 'ই-হেলথ কার্ড' কর্মসূচি চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন: হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবককে পেটানোর ঘটনায় ছাত্রদল নেতা শহিদুল ইসলাম বহিষ্কার
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বেশ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোর জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে। তবে এরপরেও দেখার বিষয় হবে যে, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে সরকারকে যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, সেই চাপ সামলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির গতি ত্বরান্বিত করতে সরকার বাজেটে কী পদক্ষেপ নেয়।
এছাড়াও, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। এসব ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আয় বাড়াতে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেটির দিকেও দৃষ্টি থাকবে অনেকের।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন