০৭:০৪ পি.এম
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদেরকে দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি নৈতিক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে। দলটি বলছে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি হলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং রাজনীতিতে নৈতিকতার মানও উন্নত হবে। কিন্তু এখন সেই দাবির প্রথম বড় পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি নৈতিক অসদাচরণের অভিযোগে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর পরে তার বিরুদ্ধে নিজের কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগও উঠে এসেছে। এই সকল ঘটনায় জামায়াতকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। জনসমালোচনা এবং গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার পর দলটি ওই সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করে। তবে এই ঘটনা একটি বড় প্রশ্নও সামনে এনেছে। যদি কোনো দল নিজেদের অন্যদের চেয়ে বেশি নৈতিক দাবি করে, তবে তাদের দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থাও কি এমন হওয়া উচিত নয় যে, শুরুতেই এ ধরনের ঘটনা ঠেকানো যাবে? কারণ, ক্ষমতা মানুষের চরিত্র তৈরি করে না, বরং মানুষের আসল চরিত্র প্রকাশ করে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নারীদের বিষয়ে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান। জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্যে বলেছেন, ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী কোনো নারী তাদের দলের নেতৃত্ব দিতে পারে না। এছাড়া, সরাসরি নির্বাচিত সংসদীয় আসনে জামায়াত কোনো নারী প্রার্থীও দেয়নি। এসব অবস্থান থেকেই বোঝা যায় রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীদের ভূমিকা সম্পর্কে দলটির দৃষ্টিভঙ্গি কী। এই বিতর্ক আরও বেড়ে যায়, যখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর উঠে আসে যে, জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ মাতৃত্বকালীন ছুটির পর নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর এবং মায়েদের ঘরে থাকতে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলেছেন। যদিও পরে তারা উল্লেখ করেন, তাদের ওই মন্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গু প্রতিরোধে তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
এটি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট। জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা বারবার এমন একটি সমাজব্যবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে নারীর মূল ভূমিকা ঘর-সংসার ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। জনজীবন এবং নেতৃত্বে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের বিষয়টি সেখানে গুরুত্ব পায় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা এবং নারী ও তরুণদের আকাক্ষার সঙ্গে অনেকটাই অসঙ্গতিপূর্ণ।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীরা কোনো গৌণ ভূমিকা পালন করে না। বরং তারা দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের রপ্তানি খাতকে পাল্টে দিয়েছে, সেখানে নারীদের অবদান সবচেয়ে বেশি। এছাড়া, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, উদ্যোক্তা খাত এবং সরকারি প্রশাসনে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। প্রতিদিন তাদের কাজ দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাই নারীদের সুযোগ সীমিত করা পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষার উপায় নয়। বরং এতে বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ইতিহাস এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। আদর্শের নামে যেসব সমাজ পরিকল্পিতভাবে নারীদের অধিকার সীমিত করেছে, তারা বেশিরভাগই উন্নতি করতে সক্ষম হয়নি। তালেবান শাসিত আফগানিস্তান এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সেখানে নারীদের শিক্ষা, চাকরি এবং জনজীবন থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এর ফলে শুধুমাত্র বিশ্বজুড়ে সমালোচনা নয়, বরং দেশটির অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দারিদ্র্য বেড়েছে। বাংলাদেশ যদিও সেই অবস্থায় নেই, তবে ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট। যখন কোনো রাজনৈতিক শক্তি নারীদের সুযোগ ও স্বাধীনতা বাড়ানোর বদলে তা সীমিত করতে চায়, তখন গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন-দু’টিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বর্তমান তরুণ প্রজন্মই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে রাজনীতিতে পরিবর্তন আনা তরুণরা প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত, বিশ্বমানের খবর সম্পর্কে সচেতন এবং রাজনৈতিক দ্বিচারিতা নিয়ে খুবই সন্দিহান। তারা শুধু নৈতিকতার দাবি শুনতে চান না। তারা চান স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, সবার জন্য সমান সুযোগ এবং জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব। কোন রাজনৈতিক দল কি বলছে, তার চেয়ে তারা বেশি গুরুত্ব দেয়, সেই দল বাস্তবে কি করছে এবং কী ধরনের নীতি অনুসরণ করছে।
আরও পড়ুন: ড. ইউনূসকে হেনস্তায় রিটায়ার্ড বিসিএস অফিসার্স প্ল্যাটফর্মের ক্ষোভ ও নিন্দা
এই রাজনীতি, যা দেশের অর্ধেক জনগণকে নেতৃত্বের জন্য অযোগ্য মনে করে, সেই রাজনীতি আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, এই প্রজন্ম সমান অধিকারকে দয়া বা বিশেষ সুবিধা হিসেবে দেখে না। তারা এটিকে গণতন্ত্রের একটি মৌলিক নীতি বলে মনে করে। এই হিসাবে জামায়াতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আগত।
ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার বা নিজেদের অন্যদের চেয়ে বেশি নৈতিক হিসেবে দাবি করলেই নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া যায় না। এর প্রমাণ কাজের মাধ্যমে দিতে হয়। এজন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, সবার জন্য একইভাবে জবাবদিহি এবং প্রতিটি নাগরিকের প্রতি সমান সম্মান।
জামায়াত যদি সত্যিই নিজেদের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর থেকে আলাদা প্রমাণ করতে চায়, তবে তারা শুধু কোনো কেলেঙ্কারির পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দল থেকে বহিষ্কার করলেই হবে না। দলটিকে নিজেদের রাজনীতির ভেতরের বড় বড় অসঙ্গতিগুলোরও মুখোমুখি হতে হবে। যেমন, একদিকে নৈতিকতার কথা বলা, অন্যদিকে অসদাচরণ ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়া। আবার একদিকে ন্যায়ের কথা বলা, অন্যদিকে নেতৃত্বে নারীদের সমান সুযোগ না দেওয়া।
বাংলাদেশের মানুষ নৈতিক রাজনীতির অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছে। এখন তারা প্রতিশ্রুতি নয়, তার বাস্তব প্রমাণ দেখতে চান।
আরও পড়ুন: ইসরাইলের নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু-ওবামা ফের বাগযুদ্ধ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন