০২:১০ পি.এম
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন থেকে কিছু নির্বাচিত আয়াত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের সামনে তিলাওয়াত করা হয়েছে।
এই আয়াতগুলো সুচিন্তিতভাবে বাছাই করা হয়েছিল এবং এটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশ ও পক্ষের প্রতি ইরানের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভবিষ্যৎ অবস্থান স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। বন্ধুদেশ এবং প্রতিরোধ শিবিরের জন্য যেখানে শাহাদাতের মর্যাদা ও অবিচল বিশ্বাসের আয়াত পাঠ করা হয়েছে, সেখানে বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বী বা নিষ্ক্রিয় পক্ষগুলোর জন্য এসেছে তিরস্কার, কাফিরদের পরিণতি কিংবা পরোক্ষ সতর্কবার্তা।
প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় তিন দিন তার মরদেহ শায়িত ছিল। সেখানে ৩০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিদল এই উক্ত অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত হন। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের প্রতিনিধিদল যখন শ্রদ্ধা জানাতে আসে, তখন সেখানে পবিত্র কোরআনের সূরা আলে ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়।
আরও পড়ুন: সৌদির ৪ অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির কারণে রেড অ্যালার্ট জারি
এই আয়াতে ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত বদরের যুদ্ধের প্রসঙ্গ রয়েছে, যেখানে সংখ্যা ও সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকা মুসলিম বাহিনীর অলৌকিক বিজয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান সৌদি আরবের ভূখণ্ডে হওয়া এই যুদ্ধের আয়াত নির্বাচন কোনোভাবেই কাকতালীয় ছিল না। এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে এটি সৌদির প্রতি প্রশংসা, সূক্ষ্ম বিদ্রূপ নাকি দুটোরই একটি জটিল মিশ্রণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আয়াত ইসলামের প্রাথমিক একটি গৌরবময় বিজয়ের ইতিহাসকে স্মরণ করায়। এটি তেহরান এবং রিয়াদের মধ্যকার একটি অভিন্ন সভ্যতাগত স্মৃতির দিকে ইঙ্গিত করে। কিন্তু সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার পটভূমিতে ইরান কেবল টিকেই থাকেনি, বরং আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এ সময় দেশটি এখন হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার খুব নিকটবর্তী অবস্থানে পৌঁছে গেছে।
বিপরীতে পুরো যুদ্ধজুড়ে সৌদি আরব নীরবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষাবলম্বন করেছে। কিছু প্রতিবেদনে এমনকি ইরানের ওপর হামলায় রিয়াদের গোপন অংশীদারিত্বের দাবিও করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে এই আয়াতের অন্তর্নিহিত অর্থ আরও বেশি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। যখন ইসরায়েল পুরো অঞ্চলকে ধ্বংসের অতলগহ্বরের দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছিল, তখন রিয়াদ হয় নীরব দর্শক ছিল নয়তো ইরানের বিরুদ্ধেও ভূমিকা পালন করেছে।
এদিকে, ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত হামাস, ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ, হিজবুল্লাহ, হুতি, হাশদ আল-শাবি এবং তালেবানের জন্য যে আয়াতগুলো নির্বাচিত হয়েছিল, সেগুলোর মূল সুর ছিল শহীদ হওয়ার, আল্লাহর প্রতি অটুট অঙ্গীকার এবং চূড়ান্ত বিজয়।
আরও পড়ুন: রাজবাড়ীতে দুর্বৃত্তের গুলিতে যুবক নিহতের ঘটনায় মামলা দায়ের
হামাস প্রতিনিধিদের জন্য সূরা আহযাবের ৬৬ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে এমন একদল মানুষের কথা ‘যারা আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার সত্য প্রমাণ করেছে।’ সেখানে বলা হয়েছে, তাদের কিছু ‘নিজের অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে’ আবার কিছু ‘নিজের সময়ের অপেক্ষায় রয়েছে।’ তবে তারা ‘নিজেদের অঙ্গীকারে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আনেনি।’
হিজবুল্লাহর জন্য নির্বাচিত আয়াতে ‘সত্যিকারের মুমিনদের’ জন্য ‘চূড়ান্ত বিজয়ের’ প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছে। সেখানে সামরিক বিপর্যয়কে এমন একটি ঐশী পরীক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যার মাধ্যমে আল্লাহ ‘শহীদ নির্বাচন করেন’। এবং কারা সত্যিকার অর্থে অবিচল রয়েছে, তা প্রকাশ করেন।
ইয়েমেনের হুতিদের জন্য সূরা আল-ফাতহের ২৯ নম্বর আয়াত বেছে নেওয়া হয়। এই আয়াতে চাপের মুখেও আনুগত্য, শৃঙ্খলা এবং বিকাশের উল্লেখ রয়েছে। আয়াতে রাসুল মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গীদের এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যারা ‘কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর’ এবং ‘পরস্পরের প্রতি দয়ালু’। এর মাধ্যমে আন্দোলনটিকে শত্রুদের বিরুদ্ধে কঠোর, কিন্তু নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ ও সংহত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও সুরা আলে ইমরানের ১৪৬ নম্বর আয়াতও তিলাওয়াত করা হয় এই দলটির জন্য। আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর পথে তাদের ওপর যা আপতিত হয়েছে, তাতে তারা হীনবল হয়নি, দুর্বলও হয়নি, নতিস্বীকারও করেনি।’
ইরাকের হাশদ আল-শাবি এবং সামগ্রিকভাবে ইরাকের জন্য পাঠ করা হয়েছে ঐ পরিচিত আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে, যারা ‘আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছে’, তাদের সম্পর্কে চিন্তা করো না। তারা জীবিত, কিন্তু সাধারণ মানুষের উপলব্ধির বাইরে।
আরও পড়ুন: কাসগঞ্জে সন্তানকে দুই লাখে বিক্রি করে অপহরণের নাটক সাজালেন নারী
ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ এবং তালেবান—উভয়ের জন্যই একই সূরা আল-ফাতহর সূচনাংশ তিলাওয়াত করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ দান করা হয়েছে, যাতে অতীত ও ভবিষ্যতের ত্রুটি ক্ষমা করা হয় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ পূর্ণতা লাভ করে।
দুই ভিন্ন প্রেক্ষাপটের সংগঠনের জন্য একই আয়াত নির্বাচন ইঙ্গিত করে যে তেহরানের আদর্শিক বলয়ে তাদের অবস্থান অভিন্ন। এর মাধ্যমে এই বার্তাও দেওয়া হয়েছে যে তালেবান যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করে, ফিলিস্তিনিরাও একদিন ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তেমনই বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারে।
অন্যদিকে, রাশিয়া, চীন, ভারত ও মিসরের জন্য ইরানের তিলাওয়াতের সুর ছিল অনেক শান্ত। এসব আয়াতে যুদ্ধের বদলে ন্যায়পরায়ণতা, আশ্বাস ও পুরস্কারের বার্তা প্রাধান্য পেয়েছে।
রাশিয়ার জন্য পাঠ করা আয়াতে বলা হয়, পরকালে রয়েছে ‘চিরস্থায়ী নিবাস’, যা তাদের জন্য সংরক্ষিত, ‘যারা পৃথিবীতে না অত্যাচার করতে চায়, না অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায়।’ আয়াতের শেষে বলা হচ্ছে, ‘চূড়ান্ত পরিণতি মুত্তাকিদেরই।’
আরও পড়ুন: মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা হবে না: ট্রাম্পের ঘোষণা
চীনের জন্য নির্বাচিত আয়াতটি ছিল আরও কোমল। সেখানে বলা হয়, আল্লাহ এটিকে তোমাদের অন্তরের প্রশান্তির কারণ ও সুসংবাদ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন, আর বিজয় কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
ভারতের জন্য হিজবুল্লাহর মতো একই আয়াত পাঠ করা হলেও হিজবুল্লাহর শহীদ ও জালিমদের প্রসঙ্গ অংশটুকু বাদ দেওয়া হয়েছে এবং কেবল তুলনামূলক নরম অংশটি বেছে নেওয়া হয়, যেখানে বলা হয়েছে তোমরা হীনবল বা দুঃখিত হইও না।
মিসরের জন্য দুটি তিলাওয়াতের একটিতে বলা হয়েছে, ‘যারা ইমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তারাই সৃষ্টির সর্বোত্তম মানুষ।’ তাদের জন্য রয়েছে এমন জান্নাত, যেখানে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে।
এদিকে কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মিসরের প্রথম তিলাওয়াত ছিল এক মাঝামাঝি অবস্থানের প্রতিফলন। তাদের প্রশংসা ও স্বাগত জানানো হলেও প্রতিরোধের অংশ হিসেবে হিসাবে দেখানো হয়নি।
আরও পড়ুন: ইসরায়েল থেকে অস্ট্রিয়াগামী বিমানে বোমা হামলার হুমকি, বুলগেরিয়ায় জরুরি অবতরণ
গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখা কাতারের জন্য পাঠ করা হয়েছে সেই একই ‘সুস্পষ্ট বিজয়ের’ আয়াত, যা ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ ও তালেবানের জন্যও ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহারের কারণে আয়াতটির অর্থ অনেকটা কোমল হয়ে যায়। এটি যুদ্ধের আহ্বান নয়, বরং সমর্থনের জন্য প্রশংসা হিসেবে উপস্থাপিত হয়। কাতারের জন্য পাঠ করা সুরা আলে ইমরানের ১৫২ নম্বর আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের ক্ষমা করেছেন। আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল।’
তুরস্কের জন্য পাঠ করা সুরা নিসার ৯৫ নম্বর আয়াত। যাতে বলা হয়েছে, ‘যারা নিজেদের সম্পদ ও জীবন দিয়ে সংগ্রাম করে’, তারা ‘যারা পেছনে থেকে যায় বা বসে থাকে’ তাদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ। এটি আত্মত্যাগ ও প্রচেষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরা একটি আয়াত।
আঙ্কারা শুরু থেকেই যুদ্ধে না জড়ানোর নীতি স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সতর্ক করেছেন যে ইসরায়েল যুদ্ধে আসক্ত এবং পুরো অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মরিয়া।
পাকিস্তানের জন্য নির্বাচিত ছিল সম্মানজনকভাবে প্রবেশ ও বের হওয়ার তাওফিক চাওয়ার একটি দোয়া। ইসলামাবাদ ও দোহা শুরু থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব কমানোর কূটনৈতিক চেষ্টা করেছে, যা ইসরায়েলকে অসন্তুষ্ট করেছে।
আরও পড়ুন: নিউইয়র্কের ৭ নতুন এলাকায় সিটিবাইক পরিষেবা সম্প্রসারণ, ৩৭০০ সাইকেল যুক্ত
মিসরের জন্য তিলাওয়াত করা প্রথম আয়াতে পরহেজগারদের জন্য ‘চিরস্থায়ী জান্নাতের’ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এটি ছিল সম্পূর্ণ পুরস্কারকেন্দ্রিক একটি আয়াত, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের কোনো চিত্র নেই। এসব সরকার যেন দুই ভিন্ন জগতের মাঝখানে অবস্থান করছে। বাণিজ্য, মধ্যস্থতা বা আঞ্চলিক রাজনীতির মাধ্যমে তারা ইরানের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের আদর্শিক অংশীদার হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে রাজি নয়।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের মতো লেবানন সরকারের প্রতিও ছিল একটি স্পষ্ট তিরস্কার, যা হিজবুল্লাহর প্রশংসার ঠিক বিপরীত। লেবাননের জন্য ইরান সুরা আন-নিসার ৬৬ নম্বর আয়াত পাঠ করে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘যদি আমি তাদের নির্দেশ দিতাম যে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করো অথবা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাও, তবে অল্প কয়েকজন ছাড়া কেউই তা মানত না। আর যদি তারা তাদের যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তা মেনে চলত, তবে তা তাদের জন্য অবশ্যই অনেক বেশি কল্যাণকর এবং অনেক বেশি দৃঢ়তা ও প্রশান্তির কারণ হতো।’
প্রসঙ্গ বিবেচনায় আয়াতটি স্পষ্টতই ভর্ৎসনার মতো শোনায়। সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেশটির সরকার ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে তারা ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর পাল্টা হামলারও সমালোচনা করেছে।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ৮৬ বছর বয়সী খামেনি মধ্য তেহরানে তার বাসভবনে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় নিহত হন। ওই হামলায় তার ১৪ মাস বয়সী নাতনি, জামাতা এবং পুত্রবধূও নিহত হন। তার মরদেহ তিন দিন ধরে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় শায়িত রাখা হয়। এটি দেশের সবচেয়ে বড় নামাজের কমপ্লেক্স এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আয়োজনের প্রধান ভেন্যু।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন