১০:২৩ এম
ঝালকাঠি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বাংলাদেশি পরিচয়ে পাসপোর্ট করতে গিয়ে এক রোহিঙ্গা তরুণী ও তার সহযোগী এক নারী আটক হওয়ার ঘটনায় বরিশালকেন্দ্রিক রোহিঙ্গা পাসপোর্ট সিন্ডিকেটের কার্যক্রমের নতুন তথ্য সামনে এসেছে। পাসপোর্ট আবেদনের সঙ্গে জমা দেওয়া কাগজপত্র, পরিচয় ও স্থায়ী ঠিকানা যাচাইয়ের সময় অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর তাদের আটক করা হয়।
আটক দুই নারীর একজন মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা তরুণী। অপরজন বরিশাল নগরীর আমানতগঞ্জ এলাকার শাকিলের স্ত্রী জাফরিন আক্তার একা (২৪)। তিনি স্বামী শাকিলের সঙ্গে নগরীর ভাটিখানা এলাকায় বসবাস করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্য ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্মনিবন্ধন, স্থানীয় ঠিকানা ও বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে পরিচয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পাসপোর্ট তৈরির একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিল। এ ঘটনায় বরিশাল নগরীর আমানতগঞ্জ, ভাটিখানা ও বেলতলা এলাকার ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।
আরও পড়ুন: মহাখালীতে ট্রেনের ধাক্কায় যুবক মো. রায়হান নিহত
আটক জাফরিন আক্তার একা চক্রটির অন্যতম সদস্য শাওনের খালাতো ভাইয়ের স্ত্রী। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্য ব্যক্তির এনআইডি ব্যবহার করে পাসপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়ায় তিনি সহযোগিতা করতেন। রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে বাংলাদেশি পরিচয়ে পাসপোর্ট তৈরির ব্যবস্থা করা হতো।
এর আগে সংগৃহীত তথ্য ও অনুসন্ধানে চক্রটির সঙ্গে শাওন, রাব্বি ও নাঈমের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। চক্রটির কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ব্যক্তিদের সংগ্রহ করে বরিশালে নিয়ে আসা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, শাওন কক্সবাজারের দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করে রোহিঙ্গাদের বরিশালে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতেন। বরিশালে পৌঁছানোর পর তাদের নির্দিষ্ট এলাকার ঠিকানা, ভুয়া মা-বাবার পরিচয় এবং আত্মীয়তার তথ্য মুখস্থ করানো হতো।
চক্রের আরেক সদস্য রাব্বির বিরুদ্ধে ভুয়া জন্মনিবন্ধন, মা-বাবার পরিচয়, স্থানীয় ঠিকানা ও বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র প্রস্তুতের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। নাঈম পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হয়ে আবেদন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন: রংপুরের কাউনিয়ায় পূজামণ্ডপে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তরুণের মৃত্যু
রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট আবেদনের আগে স্থানীয় পরিচয় শক্ত করতে আমানতগঞ্জ, ভাটিখানা ও বেলতলা এলাকার ঠিকানা ব্যবহার করা হতো। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নাম, সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে তৈরি কাগজপত্রও পাসপোর্ট আবেদনে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।
ঝালকাঠি পাসপোর্ট অফিসে সাম্প্রতিক আটকের ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে, বরিশালকে কেন্দ্র করে তৈরি করা পরিচয় ও কাগজপত্র ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী জেলার পাসপোর্ট অফিসেও আবেদন করা হয়েছে। ফলে তদন্তের পরিধি শুধু বরিশাল নগরীতে সীমাবদ্ধ না রেখে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য জেলার পাসপোর্ট অফিস ও স্থানীয় প্রশাসনের নথিও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আটক নারীদের পাসপোর্ট আবেদন ফরম, ব্যবহৃত এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, স্থায়ী ঠিকানার কাগজপত্র, মোবাইল ফোনের কললিস্ট এবং যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করলে চক্রটির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে একই ঠিকানা, একই পরিচয় বা একই প্রত্যয়নপত্র ব্যবহার করে করা পাসপোর্ট আবেদনগুলো যাচাই করলে এর বিস্তৃতি বেরিয়ে আসতে পারে।
জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নথি জালিয়াতির মাধ্যমে বিদেশি নাগরিককে বাংলাদেশি পরিচয় দেওয়ার ঘটনা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। তাই ঝালকাঠিতে আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি বরিশালকেন্দ্রিক পুরো নেটওয়ার্কের অর্থ লেনদেন, মোবাইল যোগাযোগ, জাল নথি তৈরির উৎস এবং পাসপোর্ট আবেদনে সহায়তাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
আরও পড়ুন: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের প্রতীক থাকবে না, প্রার্থী পক্ষে কাজ করতে হবে
এ ঘটনায় শাওন, রাব্বি, নাঈমসহ যাদের নাম তদন্তে আসছে, তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে পাসপোর্ট অফিসের অভ্যন্তরীণ কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা অন্য কোনো সহযোগী এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন