০৯:৩২ পি.এম
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের সামরিক অভিযান ও ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ। তিনি ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে ‘সবচেয়ে অনৈতিক সেনাবাহিনী’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের হত্যা, ধ্বংস ও বঞ্চনা অব্যাহত রয়েছে।
আজ শনিবার (২২ আগস্ট) তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘সবচেয়ে অনৈতিক সেনাবাহিনী আবারও হামলা চালিয়েছে। বারবার। বারবার।’
আলবানিজ বলেন, ‘পশ্চিম তীরে সেনা ও বসতিস্থাপনকারীরা পানির পাইপ কেটে দিচ্ছে, আর কুসরার অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চলছে এবং সেই সঙ্গে চলছে হত্যাকাণ্ড। যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইল ১ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করেছে, যাদের মধ্যে ৩০০ শিশু রয়েছে।’
আরও পড়ুন: পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি হামলায় ৭০ ফিলিস্তিনি গ্রেপ্তার, সাংবাদিকদের ওপর গ্রেনেড হামলা
তিনি আরও লিখেছেন, ‘সবচেয়ে অনৈতিক সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ ক্ষমতাসীনরা, ইতিহাসের মতোই, ভুক্তভোগীদের দেখতে বা জীবন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করছে।’
তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয়বিশ্বযুদ্ধের ৮০ বছর পর, সেই যুদ্ধের পর গড়ে ওঠা মানবাধিকারের যুগে, বিষয়টি আরও বেশি ঘৃণ্য।’
তার পোস্টে একটি ছবিও ছিল, যেখানে ফিলিস্তিনি নাগরিক ফাতি খাজেমের মৃত্যুর বিষয়ে মন্তব্য করা হয়েছে। গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) জেনিনে নিজ বাড়িতে গ্রেফতারের চেষ্টা প্রতিহত করার সময় ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে তিনি নিহত হন।
ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলি সেনারা খাজেমের কাছে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে বাধা দেয়। পরে তাকে রক্তক্ষরণে মৃত্যুর জন্য ফেলে রেখে তার মরদেহ নিয়ে যায়।
আরও পড়ুন: সৌদি আরবে হামলার সময় যাত্রীদের বাঁচাতে জীবন দিলেন বিমানবন্দর কর্মী
অধিকৃত পশ্চিমতীরের নাবলুসের দক্ষিণে অবস্থিত ফিলিস্তিনি গ্রাম কুসরার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ইসরাইলি সেটেলার তথা অবৈধ বসতিস্থাপনকারী ও সেনাদের অবরোধের মধ্যে রয়েছে। পানি, বিদ্যুৎ, খাবারসহ মৌলিক প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সরবরাহ মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে।
রাম আল-আইন এলাকায় তিনটি বাড়িতে প্রায় ১৫ জন ফিলিস্তিনি আটকা পড়েছেন বলে জানা গেছে, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। সশস্ত্র ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীরা বাড়িগুলো ঘিরে রেখেছে। অন্যদিকে ইসরাইলি সেনারা সেখানে অবস্থান নিয়ে এলাকাটিকে ‘বন্ধ সামরিক অঞ্চল’ ঘোষণা করেছে।
চাপের মুখেও পরিবারগুলো বাড়ি ছেড়ে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের দাবি, হামলা ও অবরোধের উদ্দেশ্য হলো তাদের নিজেদের জমি থেকে উচ্ছেদ করা।
কুসরার মেয়র আবদেল আজিম ওয়াদি জানিয়েছেন, ইসরাইলি সেনা ও বসতিস্থাপনকারীরা পরিবারগুলোকে বাড়িতে প্রবেশ বা বের হতে বাধা দিচ্ছে। একটি ফিলিস্তিনি বাড়ি দখল করে সেটিকে সামরিক অবস্থান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ইসরাইলি নির্বাচনে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, নতুন নির্বাচনের শঙ্কা
কুসরার সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় পরিবারগুলো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা সীমিত মজুত পানি ব্যবহার করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোও কুসরার পরিস্থিতির নিন্দা জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ঘটনাটিকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা ও ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের ক্রমবর্ধমান প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখেছে।
কুসরায় অবরোধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের হামলা, বাড়িঘরে আক্রমণ, পাথর নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণের অভিযোগ করে আসছেন।
আরও পড়ুন: কলকাতা বিমানবন্দরে দুদিন ধরে বোমাতঙ্ক, নিরাপত্তা বাহিনী তল্লাশি চালাচ্ছে
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতার কারণে পশ্চিম তীরে ২ হাজার ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্টও কুসরার পরিস্থিতির নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি এই অবরোধকে কথিত জাতিগত নির্মূলের প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের যথাযথ সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার জন্য ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করেছেন।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অধিকাংশ দেশ অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতিকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ বলে মনে করে। তবে ইসরাইল এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে।
গাজায়ও ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন আলবানিজ। তার দাবি, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরেও ইসরাইলি হামলায় ১ হাজার ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৩০০ শিশু রয়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির পরও প্রাণঘাতী হামলা অব্যাহত থাকা প্রমাণ করে যে, এই যুদ্ধবিরতি ফিলিস্তিনিদের কার্যকর সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
আরও পড়ুন: পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় জিয়াউর রহমানের ভূমিকা চিরস্মরণীয়: ওয়াদুদ ভূঁইয়া
আলবানিজ গাজার ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের বর্ণনা দিতে ‘পালভারাইজেশন’ বা গুঁড়িয়ে দেওয়ার শব্দ ব্যবহার করেছেন। তার মতে, সংঘাতের কারণে পুরো আবাসিক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি পণ্যের সংকট এবং মানবিক সহায়তার ওপর বিধিনিষেধও অব্যাহত রয়েছে।
আলবানিজ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, গাজার সংকটকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের বৃহত্তর দখলদারত্বের প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। তার মতে, গাজা থেকে পশ্চিম তীর পর্যন্ত ফিলিস্তিনিরা সামরিক শক্তি প্রয়োগ, বাস্তুচ্যুতি, বসতি সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনীয় সম্পদে প্রবেশাধিকারের ওপর বিধিনিষেধের মতো পরস্পর সম্পর্কিত নীতির মুখোমুখি হচ্ছেন।
কুসরার অবরোধ তাই নিজেদের ভূমিতে টিকে থাকার ফিলিস্তিনি সংগ্রামের আরেকটি প্রতীক হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। আলবানিজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি শুধু উদ্বেগ প্রকাশের বাইরে গিয়ে ফিলিস্তিনিদের অধিকার লঙ্ঘনের জন্য কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: রুহুল কবির রিজভী: বাংলাদেশে পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন করছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন