০২:৪৬ এম
ইতিহাস সাক্ষী—বিশ্বযুদ্ধ কখনো ঘোষণা দিয়ে শুরু হয় না। একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি নিয়ন্ত্রণহীন হামলা কিংবা একটি ব্যর্থ কূটনৈতিক উদ্যোগই অনেক সময় আঞ্চলিক সংঘাতকে বৈশ্বিক বিপর্যয়ে রূপ দেয়। আজ মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতার কথাই আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। তবে কি বিশ্ব ধ্বংসের মহাপ্রলয়ের কাউন্ট ডাউন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে?
বিশেষ করে গত ৪৮ ঘন্টায় মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ও বারুদ সম পরিস্থিতি , ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিন বাহিনী ও মধ্যপ্রাচ্য থাকা তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য ইসরাইলে ইতিমধ্যে যুদ্ধের রসদ মজুদ করা ইরান ধ্বংসের হুমকি দেয়া যেমন ভয়াবহ যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে পক্ষান্তরে ইরানও তেমনি তাদের মিত্র শক্তি গোষ্ঠীগুলোকে ভয়াবহ ও সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছে। আর এমন মরণঘাতী বা মহাপ্রলয় সংঘটিত হলে বিশ্বের অপর দুই পরাশক্তি চীন ও রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়া যদি তাদের স্বার্থ রক্ষায় মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের পরাশক্তির স্বার্থ রক্ষায় ইরানের সাথে যুক্ত হয় তাহলে বিশ্ব হয়ত দেখতে যাচ্ছে আরেকটি অকল্পনীয় ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংস লীলা যা ইতিহাসে হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে লেখা হবে।
বর্তমান সংঘাত এখনো একটি আঞ্চলিক সংকট। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা হলো, যদি এই সংঘাতে একাধিক পরাশক্তি সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক মোড় নিতে পারে। বিশেষ করে যদি সংঘাত এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে ইরানের পক্ষে বা বিপক্ষে বিশ্বের বড় সামরিক শক্তিগুলো প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়, তাহলে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে। যদি কোনো পরিস্থিতিতে চীন, রাশিয়া কিংবা উত্তর কোরিয়া প্রত্যক্ষ সামরিকভাবে ইরানের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সরাসরি মোকাবিলায় নামে, তাহলে সেই সংঘাত একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। তবে নিশ্চিত বা অবশ্যম্ভাবী না হলেও এটি একটি সম্ভাব্য চুড়ান্ত পরিস্থিতি । বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে এমন যুদ্ধ শুরু হওয়া নিশ্চিত বলা যায় না, যদিও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা এই ধরনের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন।
আজকের বিশ্ব ১৯৪৫ সালের পৃথিবী নয়। এখন পারমাণবিক অস্ত্র, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সামরিক প্রযুক্তি এবং মহাকাশভিত্তিক নজরদারি—সবকিছুই যুদ্ধের চরিত্র বদলে দিয়েছে। ফলে একটি সীমিত সংঘাতও দ্রুত বহুমাত্রিক সংকটে পরিণত হতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, আধুনিক যুদ্ধের কোনো প্রকৃত বিজয়ী থাকে না। যদি পরাশক্তিগুলো সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়, তাহলে ক্ষয়ক্ষতি শুধু যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্য নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জীবন গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশও এর বাইরে থাকবে না। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা আমাদের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
অতএব, বর্তমান পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে এটিকে অবধারিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বলাও বাস্তবসম্মত মনে না হলেও আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। বিশ্ব এখন এমন এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সংযম, কূটনীতি এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই মানবসভ্যতাকে আরও বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে। তা না হলে একটু সামান্য সামরিক ভুল সিদ্ধান্ত বিশ্বে মহাপ্রলয় ঘটানোর জন্য যথেষ্ট।
ইতিহাসের শিক্ষা একটাই—যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু তার শেষ কোথায় হবে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। তাই আজ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সঙ্গে শুধু একটি অঞ্চলের নয়, পুরো বিশ্বের ভবিষ্যতের উদ্বেগও জড়িয়ে আছে। এমন বিশ্ব ধ্বংসের ধ্বংস-লীলা দেখার জন্য কি বিশ্ববাসী প্রস্তুত? - মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আজকের দিনে এমন আশঙ্কা করা অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন