০৬:৩৫ পি.এম
খুলনার পাইকগাছায় বিদ্যুতের সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে চাহিদার তুলনায় কমে গেছে, যার কারণে তীব্র লোডশেডিং ঘটছে। সম্প্রতি, গত কয়েক দিন ধরে দিনের বিভিন্ন সময় মিলিয়ে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার অভিযোগ করছে এখানে বসবাসকারী বাসিন্দারা। এই পরিস্থিতি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে। এ ছাড়া, বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য ও কলকারখানার কার্যক্রমও প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। রাতের বেলায়ও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনায় ঘুম ও দৈনন্দিন কাজে বিঘ্ন ঘটছে। শুধু বাসাবাড়ি নয়, দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র শিল্প ও বিভিন্ন মিল-কলকারখানায়ও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পাইকগাছা জোনের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় মোট প্রায় এক লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন, যাদের মধ্যে সচল গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৮৫ হাজার। এই গ্রাহকদের জন্য প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ মেগাওয়াট। কিন্তু গত দুই দিন ধরে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় অনেক কম, মাত্র ৩ থেকে ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ মিনিটে ডেঙ্গুতে যুবকের মৃত্যু
চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে এই বড় ধরনের ঘাটতির সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানাচ্ছেন। পাইকগাছার অর্থনীতির একটি বড় অংশ মাছ চাষ ও মাছের ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট এই খাতেও প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে বরফকলগুলোতে পর্যাপ্ত বরফ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মাছ সংরক্ষণ এবং পরিবহনে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
পাইকগাছা মৎস্য আড়ৎদারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল মোড়ল বলেছেন, মাছ সংরক্ষণের জন্য নিয়মিত বরফের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় বরফকলগুলো স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। এর ফলে সময়মতো বরফ পাওয়া যাচ্ছে না এবং মাছের সংরক্ষণ এবং পরিবহনে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এই অবস্থায় মাছ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বরফের সংকট তৈরি হয়েছে। একদিকে মাছ সংরক্ষণে সমস্যা হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়তি দামে বরফ কিনতে হচ্ছে। এই কারণে ব্যবসায়িক খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন মিল-কলকারখানার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। ধান, চাল ও তেল মাড়াইসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় শ্রমিকদের বসে থাকতে হচ্ছে। এতে মালিকদের উৎপাদন ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এবং শ্রমিকরাও কর্মঘণ্টা হারাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: পীরগঞ্জের ইউএনওর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগে ক্ষোভ
গোপালপুরের নাহিদ হাসান রাইস মিলের মালিক আমিনুর রহমান বলেন, বিদ্যুতের সমস্যার কারণে মিলটা ঠিকমতো চালাতে পারছি না। কখন বিদ্যূৎ আসবে, কখন চলে যাবে, তা জানি না। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় চালের দামেও প্রভাব পড়ছে।
মিলের শ্রমিক শফিকুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় মিল চলে না। মিল বন্ধ থাকলে আমাদের কাজ থাকে না এবং কাজ না থাকলে মালিকেরাও ঠিকমতো বেতন দিতে পারেন না। এই অবস্থায় আমরা খুব অসহায় হয়ে পড়েছি।
লোডশেডিংয়ের কারণে পাইকগাছার বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীরাও সমস্যায় পড়েছেন। দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ না থাকার কারণে বেচাকেনা কমে যাচ্ছে। কম্পিউটার, ফটোকপি, প্রিন্টিং, অনলাইন সেবা, মোবাইল ও ইলেকট্রনিকসের দোকানসহ বিদ্যুৎনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলেন, বিদ্যুৎ না থাকার কারণে জেনারেটর বা বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে। এর ফলে বাড়তি জ্বালানি খরচ হচ্ছে। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এই বাড়তি খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি নেতা আলহাজ্ব মোঃ খসরুল আলমের শুভেচ্ছা
এছাড়া বিদ্যুতের অভাবে বাসাবাড়িতে পানির মোটর চালানো, মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানোসহ দৈনন্দিন কাজগুলো ব্যাহত হচ্ছে।
খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পাইকগাছা জোনের উপমহাব্যবস্থাপক অঞ্জন কুমার সরকার বলেন, পাইকগাছা উপজেলায় দৈনিক প্রায় ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু গত দুই দিন ধরে আমরা মাত্র ৩ থেকে ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেয়ে এসেছি। এই কারণে আমাদের গ্রাহকদের কাছে জবাবদিহি করতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের হস্তক্ষেপ দরকার। এবং সরবরাহ পর্যাপ্ত না হলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
আর্কষণ করে বলছেন, কয়েকদিন ধরে যে মাত্রায় লোডশেডিং হচ্ছে, তা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে নজিরবিহীন। দিনের ও রাতের দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার ফলে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। স্থানীয় অভিযোগ করেছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শুধু সাধারণ মানুষের দুর্ভোগই বাড়বে না, ক্ষতির মুখে পড়বে মাছ ব্যবসা, কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম, মিল-কলকারখানা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা। এতে সামগ্রিকভাবে স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই, তারা দ্রুত বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়িয়ে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যুতের ঘাটতির স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেছেন।
আরও পড়ুন: রাজবাড়ীর কালুখালীতে মোটরসাইকেল-ভ্যানের সংঘর্ষ, ট্রাকের চাপায় মাদ্রাসাছাত্র নিহত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন