১১:২৮ এম
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সরকারের পক্ষ থেকে আরও ৫ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখা এবং জ্বালানি খাতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশে ৯০ দিনের জন্য মজুত সক্ষমতা বিবেচনায় রেখে আরও ৪ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল (গ্যাস অয়েল) এবং ৯০ হাজার মেট্রিক টন জেট ফুয়েল (উড়োজাহাজের জ্বালানি) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সিঙ্গাপুরের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ‘ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড’ এই জ্বালানি সরবরাহ করবে, যার ব্যয়ের পরিমাণ ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
আরও পড়ুন: মাদক নিয়ন্ত্রণে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে: বিদ্যুৎমন্ত্রী
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই জ্বালানি তেল ক্রয়ের কাজ করছে। সম্প্রতি, বিপিসির এ সংক্রান্ত প্রস্তাব সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে বলেন, ‘সরকার সাধারণত প্রতি ছয় মাস অন্তর দেশের চাহিদার ভিত্তিতে জ্বালানি তেল, বিশেষ করে ডিজেল ও জেট ফুয়েল আমদানি করে থাকে। এ কারণে জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাসের চাহিদার বিপরীতে বিপিসি একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে প্রদান করে। পরবর্তীতে সেটি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। কমিটি ইতোমধ্যে অনুমোদন প্রদান করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা প্রশাসনিক ছাড়পত্র দিয়ে সেটি বিপিসির কাছে প্রেরণ করেছি। এখন পরবর্তী প্রক্রিয়া হিসেবে বিপিসি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে নোয়া (নোটিফিকেশন অব এওয়ার্ড) প্রদান করবে। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে শুরু করবে।
বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উদ্ভূত ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সংকটের কারণে পৃথিবীজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা চরম পর্যায়ে পৌছেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের একটি সাহসী ও দূরদর্শী উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা হচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সঠিকভাবে পরিচালনা রাখা, শিল্পোৎপাদন ও কৃষিকাজ সচল রাখা এবং আকাশপথের যোগাযোগ সঠিক রাখতে বড় ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা ও ঐক্যবদ্ধ কাজের আহ্বান রিজভীর
বিপিসির ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মো. মিজানুর রহমান বাসসকে জানান, গত ১০ জুন সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির আন্তর্জাতিক দরপত্রের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার চিঠি ১৭ জুন পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ‘নোয়া’ ইস্যু করা হয়েছে। এখন চূড়ান্ত চুক্তির পর খুব দ্রুতই তেল সরবরাহ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তিনি আরও জানান, ‘বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে—যেকোনো মূল্যে দেশে ৯০ দিনের জ্বালানি তেল মজুত রাখা হবে। বর্তমানে প্রায় ৬০ দিনের মজুত আছে। চাহিদা মেটানোর জন্য প্রতি ছয় মাস পর পর নিয়মিত তেল আমদানি করা হবে।’
আর্থিক ব্যয় ও ডলারের হিসাব :
গত ২৪ মে জ্বালানি বিভাগে পাঠানো বিপিসির এক প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, জুন-আগস্ট সময়সীমার মধ্যে চাহিদার নিরিখে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল এবং ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল আমদানি করা হবে। দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দরপত্রের পরিমাণে কিছুটা কমবেশি রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের গত ১৩ মে তারিখের ডলারের বিনিময় হার (১ ডলার সমান ১২৩.২৫ টাকা) অনুযায়ী এই আমদানি হতে পারে মোট ব্যয় ৬২ কোটি ২৫ লাখ ২৮ হাজার ৬৫৬ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা এবং ডলারের মূল্যের পরিবর্তনের কারণে প্রকৃত ব্যয় কিছুটা কমবেশি হয়ে যেতে পারে। এই আমদানির খরচ বিপিসির নিজস্ব তহবিল এবং প্রয়োজনে ঋণ বা সরকারি সহায়তার মাধ্যমে মেটানো হবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ রয়েছে।
আরও পড়ুন: ফ্যাসিবাদী শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে দাসত্বের সাংবাদিকতার কারণে: কাদের গনি চৌধুরী
উদ্বেগজনক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাজার পরিস্থিতি:
বৈশ্বিক উদ্বেগজনক প্রেক্ষাপট এবং বাজার পরিস্থিতির বিষয়ে বিপিসির প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার অভাবে জাহাজগুলো দীর্ঘ বিকল্প রুট ব্যবহার করছে, ফলে ট্রানজিট সময় এবং পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে। পাশাপাশি বিমা কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম এবং জাহাজ ভাড়া দাবি করছে।
প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়ে বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। ২০২২ সালে ডিজেলের সর্বোচ্চ দর প্রতি ব্যারেল ১৭৮.৯১ ডলার থাকলেও, ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল তা রেকর্ড ২৮৪.৯৫ ডলারে পৌছেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ডিজেলের গড় দর ৮৫.৯৯৭ ডলার থাকলেও এপ্রিলে তা ১১৮.৫০ শতাংশ বেড়ে ১৮৭.৯০৪ ডলার হয়ে গিয়েছিল।
বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার কারণে এবার প্রিমিয়াম কিছুটা বাড়লেও, উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রাপ্ত এই দরটিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে যৌক্তিক মনে করছে বিপিসির দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি।
আরও পড়ুন: গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের জন্য আন্দোলন করছে সরকার: এমপি দিপু
দেশে জ্বালানির ঘাটতি নেই :
জ্বালানি মজুত নিয়ে আশ্বস্ত করে জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। আগামী ৬০ দিনের জন্য যথেষ্ট মজুত রয়েছে। ডলার সংকটের মধ্যে এলসি খোলার ক্ষেত্রে সরকার অগ্রাধিকার দেওয়ায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার কোনো আশঙ্কা নেই।
এ বিষয়ে যুগ্মসচিব মনির হোসেন বাসসকে বলেন, ‘দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইনে কোনো ধরনের বাধা বা সংকটের আশঙ্কা নেই।’
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণে একটি স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলা বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তাদের স্বস্তি দেবে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি মজুত ক্ষমতা বৃদ্ধি করার কাজ চলছে। যেকোনো মূল্যে শিল্প এবং কৃষিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর।
আরও পড়ুন: হাম উপসর্গে আরও ৩ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১,৩৯৬
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন