০৯:৩৯ পি.এম
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত মন্তব্য করেছেন যে, পৃথিবীর কোথাও নীতিনির্ধারকরা হাসপাতালে গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়া দেখেননি। তিনি চিকিৎসক হিসেবে এমন কাজ মেনে নিতে পারেন না বলেও জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ডেঙ্গু সংকট মোকাবিলায় করণীয় শীর্ষক এই বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করেছে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম।
আরও পড়ুন: মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় হানিফসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে আজ রায়
বিশেষ অতিথির বক্তব্যের শুরুতে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী হাসপাতালের নীতিনির্ধারকদের সাংবাদিক নিয়ে উপস্থিত হওয়ার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, "পৃথিবীর প্রায় ৩০-৪০টা দেশে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে পরম করুণাময় আল্লাহর অশেষ রহমতে। আমি পৃথিবীর কোথাও এ বিষয়টা দেখিনি যে, একটি হাসপাতালে আমরা নীতি-নির্ধারকরা যখন যাই, সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত বিদগ্ধ এবং প্রিয় গণমাধ্যমকর্মীদেরকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে আমরা হুরহুর করে ঢুকে পড়ি।"
তিনি আরও বলেন, "গিয়ে সেখানে বিভিন্ন পরিস্থিতি দেখতে পাই। একদিকে পেশেন্টরা থাকেন, পেশেন্টের অ্যাটেনডেন্টসরা থাকেন, সঙ্গে আমরা ডাক্তার সাহেবদেরকে নিয়ে যাই। এইটা আমি আমার জনস্বাস্থ্য কর্মজীবনে পৃথিবীর কোনো দেশে, কোনো পলিসি মেকারকে এই কাজটা করতে আমি দেখিনি।"
প্রতিমন্ত্রী বলেন, "বারবার বলছি, আমি চিকিৎসক—এই পরিচয় আমি চাইলেও আমার গা থেকে মুছে ফেলতে পারব না। তাই এ বিষয়টা আমি কখনোই মেনে নিতে পারি না।" তিনি বলেন, "আমি সাত মাস হলো দায়িত্বে আছি, অনেক সেমিনারে গিয়েছি, অনেক জনসভায় বক্তব্য দিয়েছি, ১ লক্ষ ৭০ হাজার মানুষ আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে, সুতরাং লক্ষাধিক মানুষের জনসভায়ও আমরা বক্তব্য রেখেছি। কিন্তু এই কাজটি কখনোই করা যাবে না বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।"
তিনি আরও বলেন, "যারা যে অবস্থান থেকে এই কাজটি করছেন, আমি একজন চিকিৎসক হিসেবে, নীতি-নির্ধারক হিসেবে এই কাজের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।"
আরও পড়ুন: ডিসেম্বরে খুলছে পঞ্চবটি-মুক্তারপুর দ্বিতল সড়ক, টোল নির্ধারণ
প্রতিমন্ত্রী বলেন, "এই কাজগুলোর কনসিকোয়েন্স হচ্ছে, আজকে সকালে যে পরিস্থিতি আমরা দেখছি, এই কাজগুলোর কনসিকোয়েন্স হচ্ছে জনগণ, রোগী এবং চিকিৎসক—তাদেরকে সবাইকে আজকে মুখোমুখি করে দেয়া হয়েছে। সবকিছুরই একটা কজ-ইফেক্ট রিলেশনশিপ আছে।"
তিনি বলেন, "এই কাজগুলো আমরা যখন করি, তখন আমরা ভাবি না যে, বাংলাদেশের এই ২০ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য যে চিকিৎসকদেরকে আমরা দায়িত্ব দিয়েছি, তাদেরকে হাত-পা বেঁধে দায়িত্বে নামিয়েছি, নাকি লাইফ জ্যাকেট পরে সাঁতার কাটতে দিচ্ছি? কি পরিস্থিতিতে তারা কাজ করছে?"
বিগত ১৫ বছরে স্বাস্থ্যখাত দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার শিকার হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, "বিশেষ করে বিগত ১০ বছর বা ওদের শেষ ৫ বছর, আমি সারা বাংলাদেশে ঘুরে ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়েছি দায়িত্ব নেয়ার পর, উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়েছি।"
তিনি আরও বলেন, "ঢাকার ইনস্টিটিউটগুলোর হাসপাতালগুলোতে দেখেছি, মেডিকেল কলেজে গিয়েছি সরকারি এবং বেসরকারি সব।"
আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত যুবক নিশাত মিয়ার মৃত্যু
প্রতিমন্ত্রী বলেন, "সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিগত বছরগুলোর দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের ইউনিয়ন পর্যায় থেকে একেবারে শীর্ষস্থানীয় ইনস্টিটিউট পর্যন্ত বেশিরভাগ জায়গা—অলমোস্ট এভরিহোয়ার ৫০% পদ শূন্য রয়ে গেছে।"
তিনি বলেন, "আমি চিকিৎসক দিচ্ছি প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক এবং একইভাবে প্রত্যেকটি হাসপাতালে, প্রত্যেকটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে অন্তত দ্বিগুণ, প্রায়শই তিনগুণ রোগী বসবাস করছে।"
প্রতিমন্ত্রী বলেন, "তাহলে তিনগুণ রোগী দিচ্ছি, অর্ধেক ডাক্তার দিচ্ছি—অর্থাৎ মাথাপিছু একজন ডাক্তারকে ৬ গুণ, তার ক্ষমতার বাইরে ৬ গুণ রোগী প্রত্যেকদিন তাকে ডিল করতে হয়।"
তিনি বলেন, "সেই ধন্যবাদ আমরা দিতে পারিনি আপনাদেরকে।"
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
চিকিৎসকরা অত্যন্ত বাজে পরিস্থিতিতে কাজ করেন উল্লেখ করে ড. এম এ মুহিত বলেন, "কিছু কিছু দেশে আমাদের মতো প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করতে হয়।"
তিনি বলেন, "সেই দেশগুলোর সংখ্যা খুব কম।"
তিনি আরও বলেন, "সেই দেশগুলো মূলত কোনো না কোনো যুদ্ধপীড়িত দেশ, যুদ্ধাক্রান্ত দেশ, দুর্ভিক্ষাক্রান্ত দেশ।"
প্রতিমন্ত্রী বলেন, "কিন্তু স্বাভাবিক শান্ত পরিস্থিতির কোনো দেশে এইরকম চ্যালেঞ্জিং অবস্থার মধ্যে শুধু চিকিৎসক নয়, নার্সদের কথা বলেন, সারাটা দিন-রাত তারা পরিশ্রম করছে।"
আরও পড়ুন: বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় সড়কে প্রাণ গেল ইতালি প্রবাসী তানভীরের
তিনি বলেন, "অধিকাংশ হাসপাতালে যন্ত্রপাতি আছে, সেই যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য যে টেকনিশিয়ানদের দরকার, মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের দরকার, তাদেরকেও কিন্তু আমরা সঠিকভাবে রাখতে পারিনি।"
প্রতিমন্ত্রী বলেন, "আমরা একটা সরকার হিসেবে মাত্র ৬-৭ মাস হলো দায়িত্বে এসেছি।"
তিনি বলেন, "আমরা এসে এই ১৫ বছরের জঞ্জাল এবং অব্যবস্থাপনা আমাদের গায়ে এসে পড়েছে, আমরা সেটাকে হ্যান্ডেল করছি।"
প্রতিমন্ত্রী বলেন, "ডাক্তারদেরকে এই অবস্থায় ঠেলে দিয়ে এবং ডাক্তারদের সঙ্গে জনগণকে মুখোমুখি করে দিয়ে আসলে এদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন হবে না।"
আরও পড়ুন: হাসিনার পতনের আগে ইউনূসকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান করেন শফিকুল আলম
তিনি বলেন, "সেখানেই সেই কার্যকারণের কথা চলে আসে—এই কাজগুলো কি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে?"
তিনি বলেন, "কেউ কি চাচ্ছেন যে, আমাদের এই ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরো দীর্ঘদিন ভেঙে থাকুক?"
তিনি বলেন, "কেউ কি চাচ্ছেন এই ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা বজায় থাকলে আজকে আমাদের যে তরুণ শিক্ষার্থীরা বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে, চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে তারা চিকিৎসক হতে এসেছেন, তারা তো আর এই ব্যবস্থায় কাজ করবেন না!"
তিনি বলেন, "তারা—আমরা জানি, তাদের অনেকেই ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ার, থার্ড ইয়ার থেকেই USMLE বা PLAB-এর জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।"
তিনি বলেন, "তারা চলে যাবেন এই দেশটিকে ছেড়ে।"
তিনি বলেন, "এই দেশটিকে মেধা শূন্য করা হবে, এদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, এদেশের রোগীরা পার্শ্ববর্তী, দূরবর্তী বিভিন্ন দেশে চলে যাবে—এইটাই হয়তো সেই সমস্ত গোষ্ঠীর লক্ষ্য যারা আজকে এই অস্থির পরিবেশটা তৈরি করছে।"
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ভীষণ চাপের মধ্যে আছে বলেও মন্তব্য করেন ড. এম এ মুহিত।
তিনি বলেন, "আমি ব্যক্তিগতভাবে এই দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে।"
তিনি বলেন, "আমাদের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করেছেন।"
তিনি বলেন, "এখন এই বাজেট বাস্তবায়নের দায়িত্ব কিন্তু আমাদের।"
তিনি বলেন, "আর সেই বাজেটটা বাস্তবায়ন যদি আমাকে করতে হয়, সামান্য যতটুকু লেখাপড়া করেছি—একটা পিএইচডি আছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়েছি, এইটুকু বুঝি যে শুধু টাকা দিয়ে স্বাস্থ্য হয় না, শুধু ডান্ডা পিটিয়ে স্বাস্থ্য হয় না, শুধু ক্যামেরার সামনে বড় বড় বক্তৃতা দিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঠিক করা যাবে না।"
তিনি বলেন, "এটাকে ঠিক করতে হলে আপনাদেরকে আস্থায় আনতে হবে, আপনাদের আমাদের ওপর আস্থা আসতে হবে, কেবল তখনই জনগণ আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসের প্রতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরে পাবে।"
অনুষ্ঠানে ডেঙ্গু মোকাবেলাসহ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উত্তরণে সেবার চেয়ে প্রতিরোধে গুরুত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, "আমরা রোগ প্রতিরোধের ওপরে জোর দেব।"
তিনি বলেন, "আমরা যদি মৃত্যুর হার কমাতে চাই, আক্রান্তের হার কমাতে চাই, প্রথম কাজটি হচ্ছে প্রিভেনশনের জন্য কাজ করতে হবে।"
তিনি বলেন, "সেই প্রিভেনশনের জন্য একদিকে যেমন আমাদের চেষ্টা করতে হবে, আমাদের এই মশার যেখানে প্রজনন হয়, সেই লার্ভাকে আমাদেরকে ধ্বংস করে দিতে হবে, এবং সেই কাজটি করতে গেলে আমাদের জনগণের ব্যাপক সম্পৃক্ততা লাগবে।"
তিনি বলেন, "পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে, শুধুমাত্র সরকার কিংবা প্রতিষ্ঠান প্রধানরা এই সারা বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে পরিবর্তন করতে পারবে না।"
ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদের সভাপতিত্বে বৈজ্ঞানিক সেমিনারে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এ. কে এম শামসুল কবির বাবু এবং হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল শাখা ড্যাবের সভাপতি ডা. এ কে এম মাসুদ আক্তার জিতু বক্তব্য রাখেন।
এতে কী-নোট বক্তব্য উপস্থাপন করেন জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসরিন সুলতানা ও মুগদা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মুস্তাফিজুর রহমান।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন