১২:৩৯ পি.এম
ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরান সমর্থিত হুথিদের দ্বারা দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সংঘটিত এ হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র দুটি বিমানবন্দরের রানওয়ের নিকটে আঘাত হানে। এ সময় একটি বিমান উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি বিমানটির থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে আঘাত হানে। দেশটির পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এতে যাত্রী ও ক্রুদের মধ্যে কেউ হতাহত হয়নি।
এক দিন আগে একই শহরে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছিল হুথিরা। ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-এরিয়ানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে বলেন, শুক্রবার এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের কাছে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এ সময় একটি বিমান উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি বিমানটির থেকে প্রায় ৫০০ মিটার বা ১ হাজার ৬৪০ ফুট দূরে পড়ে।
তিনি জানান, এ ঘটনায় সব যাত্রী ও বিমানের ক্রুরা নিরাপদে আছেন। সম্ভাব্য ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় এড়ানো যাওয়ার জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আল-এরিয়ানি। বিমানবন্দরে হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
আরও পড়ুন: ঋণ গ্রহণের ব্যয় বৃদ্ধিতে সীমিত পরিসরের বাজেটের পথে যুক্তরাজ্য
তবে হুথিরা বিমানবন্দরে হামলার কথা সরাসরি স্বীকার করেনি। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার হুথিদের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে সামরিক সূত্রের বরাতে জানানো হয়, এডেন প্রদেশে বদর শিবিরে সৌদি বাহিনীর কমান্ড সদর দপ্তর এবং একটি অস্ত্রের গুদাম লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
ইয়েমেনে পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের সদর দপ্তর এডেনে অবস্থিত। দেশটিতে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও ইরান সমর্থিত হুথিদের মধ্যে নতুন করে তীব্র লড়াই চলছে। দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত আরো জোরালো হয়েছে।
মারিবে সরকারি বাহিনীর অগ্রগতির দাবি
গত শুক্রবার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, রাজধানী সানার উত্তর-পূর্বে মারিব প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে তারা অগ্রগতি অর্জন করেছে। সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলি বলেন, বিমান সহায়তায় পরিচালিত অভিযানে সরকারি বাহিনী উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলোও নিজেদের দখলে নিয়েছে।
আরও পড়ুন: স্পেনে দ্রুতগামী দুই ট্রেনের সংঘর্ষে ১০ জন নিহত
আল-নাজিলির দাবি, ২৪ ঘণ্টায় সরকারি বাহিনীর অভিযানে হুথিদের ৪৩০ জনের বেশি যোদ্ধা ‘নিষ্ক্রিয়’ হয়েছেন। এ ছাড়া হুথিদের শতাধিক যানবাহন ও সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস বা অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব দাবির বিষয়ে হুথিদের বক্তব্য জানা যায়নি। যুদ্ধের আরেক গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্র তায়েজ প্রদেশেও লড়াই চলছে। পশ্চিমা সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর দাবি, সেখানে হুথিদের বেশ কয়েকটি বড় ধরনের হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। এতে হুথিদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া তায়েজ এলাকায় হুথিদের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষ ড্রোন পরিচালনাকারী দলকেও আটক করার দাবি করেছে সরকারি বাহিনী।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুথিরা ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তায়েজ ঘিরে ফেলেছে। শহরটি থেকে দক্ষিণে এডেন যাওয়ার প্রধান সড়ক বন্ধ করে দেওয়ায় ব্যাপকসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এতে ওই অঞ্চলের মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।
রিয়াদের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত
আরও পড়ুন: শিক্ষার্থী বিনিময় থেকে মহাকাশ: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার নতুন অংশীদারিত্ব
এদিকে শুক্রবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদসহ দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে এই জোট।
সৌদি আরবের অভিযোগ, ইরান হুথিদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশটির বিরুদ্ধে হামলায় উৎসাহিত করছে। তবে শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরান বলেছে, হুথিদের কোনো সামরিক অভিযানে ইরান জড়িত নয়। একই সঙ্গে হুথি ও রিয়াদের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাবও আবার তুলে ধরেছে দেশটি।
ইয়েমেনে নতুন করে তীব্র হচ্ছে গৃহযুদ্ধ
২০১৪ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ওই বছর হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে সরকারকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। হুথিরা ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত। আরবি এই নামের অর্থ ‘আল্লাহর সমর্থক’।
আরও পড়ুন: রাহুলের অভিযোগ, টাটা গোষ্ঠীকে ‘ধ্বংসের’ জন্য মোদি-শাহকে নিশানা
এর পর ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক সামরিক জোট হস্তক্ষেপ করে। এরপর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে বছরের পর বছর লড়াই চলে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের সমর্থনে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এতে বড় ধরনের সংঘর্ষ অনেকটাই কমে আসে। তবে গত জুলাইয়ে হুথিরা সৌদি আরবের বন্দর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ ঘোষণার পর থেকে উত্তেজনা বেড়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে হুথিরা আকস্মিক স্থল অভিযান চালিয়ে লোহিত সাগর উপকূলের বন্দরনগরী মোখায় অগ্রসর হয়। এ সময় ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর অনুগত সেনারা শহরটি থেকে পিছু হটে। একই মাসে হুথিরা দেশটির পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের আরো কিছু এলাকা দখল করে নেয়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাইয়ুন দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে যায়।
সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা অভিযানে ইয়েমেনের সংঘাত আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এডেন বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং সৌদি আরবের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনা আঞ্চলিক উত্তেজনাও বাড়িয়ে তুলেছে।
আরও পড়ুন: স্পেনে দুই উচ্চগতির ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত ৩৯
উল্লেখ্য, রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের একটি বড় অংশ এবং প্রধান সরকারি অফিসগুলোর নিয়ন্ত্রণ মূলত হুথিদের হাতেই রয়েছে। ২০১৪ সালের শেষের দিকে হুথিরা সানা দখল করার পর থেকেই তারা সেখানে নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো ও সরকার পরিচালনা করে আসছে। তবে, কূটনীতি এবং জাতিসংঘের দপ্তরে ইয়েমেনের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি ভোগ করে কথিত ‘সরকারি বাহিনী’, যাদের সঙ্গে হুথিদের সংঘাত চলছে।
এএম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন