১২:৪০ পি.এম
মা ইলিশ রক্ষায় নদ-নদী ও সাগরে নিষেধাজ্ঞা চলছে টানা ২২ দিন। বরগুনায় অভিযান, মোবাইল কোর্ট এবং বাজার তদারকি জোরদার করা হয়েছে আইন ভাঙা ঠেকাতে। ৮ থেকে ১৬ অক্টোবরের মধ্যে ১২৮টি অভিযান এবং ৩১টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে ১ দশমিক ১৩৫ টন ইলিশ এবং ২ দশমিক ১৫ কিলোমিটার অবৈধ জাল। সাত জেলেকে আটক করা হয়েছে এবং একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে, অভিযানের এই তৎপরতার মধ্যে নিষেধাজ্ঞার সময় জীবিকা বন্ধ হয়ে যাওয়া জেলেদের সহায়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নিবন্ধিত ১২ হাজার ৫০০ জেলে সরকারি খাদ্যসহায়তার তালিকার বাইরে রয়েছেন। এছাড়াও, নিবন্ধনবঞ্চিত বিপুলসংখ্যক জেলের জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বরগুনার ছয় উপজেলা- সদর, আমতলী, তালতলী, পাথরঘাটা, বেতাগী ও বামনায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মৎস্য বিভাগ কাজ করছে। সদর, পাথরঘাটা ও তালতলীর সমুদ্রগামী জেলেদের পাশাপাশি বিষখালী, পায়রা ও বলেশ্বর নদনির্ভর জেলেরাও মাছ ধরা থেকে বিরত রয়েছেন। ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া নিষেধাজ্ঞা ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এ সময় ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ।
ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে, এ সময় জেলে পরিবারগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকা সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। বরগুনার সরকারি সহায়তার পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত জেলেদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলতি দফায় ঘোষিত খাদ্যসহায়তার আওতায় নেই।
আরও পড়ুন: সাতক্ষীরায় যুবককে পিটিয়ে হত্যা, প্রধান আসামী ফজলুল হক আমিনী গ্রেফতার
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৫২ হাজার ৪৭৬ জন। চলতি নিষেধাজ্ঞায় ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় তাঁদের মধ্যে ৩৯ হাজার ৯৭৬ জনকে পরিবারপ্রতি ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন।
হিসাব অনুযায়ী, নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে ১২ হাজার ৫০০ জন এ দফায় ঘোষিত চালসহায়তার আওতায় নেই। অর্থাৎ নিবন্ধিত জেলেদের প্রায় ২৪ শতাংশই এই সহায়তা পাচ্ছেন না। এর বাইরে অনিবন্ধিত জেলের সংখ্যা আরও প্রায় অর্ধলাখ বলে স্থানীয় পর্যায়ে দাবি রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের একটি বড় অংশ খাদ্যসহায়তার বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিবন্ধিত হয়েও সহায়তা না পাওয়া জেলেদের কারণ নির্ধারণ, উপকারভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়া পর্যালোচনা এবং অনিবন্ধিত প্রকৃত জেলেদের শনাক্ত করা জরুরি হয়ে উঠেছে। উপজেলা-ভিত্তিক বরাদ্দ, উপকারভোগীর তালিকা ও চাল বিতরণের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করা হলে সহায়তা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় জেলেদের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। সংসারের খরচ, ঋণের কিস্তি, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা এবং মাছ ধরার সরঞ্জাম মেরামতের ব্যয় থেমে থাকে না। কেউ জাল মেরামত করছেন, কেউ নৌকা ও ট্রলারের যন্ত্রপাতি ঠিক করছেন। কিন্তু এসব প্রস্তুতির মধ্যেও নগদ অর্থের সংকট কাটছে না। পরিবারপ্রতি ২৫ কেজি চালের সহায়তা কিছুটা স্বস্তি দিলেও সব ধরনের ব্যয় মেটানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়।
আরও পড়ুন: শিবগঞ্জে কৃষি বিভাগের অভিযানে ১৬৯ বস্তা রাসায়নিক সার জব্দ
পাথরঘাটার মাছ অবতরণকেন্দ্রকেন্দ্রিক জেলেদের নিষেধাজ্ঞার সময় আয় বন্ধ থাকা, সংসারের খরচ ও ঋণের কিস্তি নিয়ে তাঁদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। সেখানে চালের পাশাপাশি নগদ সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন জেলেরা।
মৎস্য বিভাগের দেওয়া অভিযানসংক্রান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৮ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত বরগুনায় ১২৮টি অভিযান ও ৩১টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় ৩৯টি মাছ অবতরণকেন্দ্র, ২০০টি মাছঘাট, ৩৭৩টি আড়ত এবং ৩৭৬টি বাজার পরিদর্শন করা হয়।
অভিযানে ১ দশমিক ১৩৫ টন ইলিশ ও ২ দশমিক ০১৫ কিলোমিটার অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা সামগ্রীর আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬৮ লাখ ৬৯ হাজার ৭০০ টাকা। এ সময় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং সাত জেলেকে আটক করা হয়েছে।
মা ইলিশ রক্ষা শুধুমাত্র অভিযান পরিচালনার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের মৎস্যসম্পদ, ভবিষ্যৎ উৎপাদন এবং উপকূলীয় জনগণের জীবন-জীবিকা। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর না হলে ইলিশের প্রজনন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা জেলেরা খাদ্য ও জীবিকার সংকটে পড়লে তাঁদের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়ে।
আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মন্দিরে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ইলেকট্রিশিয়ানের মৃত্যু
সচেতন মঙ্গল মনে করেন, অবৈধ মাছ ধরা, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ বন্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সময়মতো খাদ্যসহায়তা পৌঁছানো, তালিকাবঞ্চিত প্রকৃত জেলেদের শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনে নগদ সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। সহায়তা বিতরণের অগ্রগতি ও উপকারভোগীদের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। মা ইলিশ রক্ষায় জেলেদের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার পাশাপাশি তাঁদের ন্যায্য সহায়তা নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অভিযানকে কার্যকর ও টেকসই করতে হলে নদ-নদী ও সাগরে নজরদারির পাশাপাশি জেলে পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা এবং জীবিকা সুরক্ষায়ও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন