১২:৪২ পি.এম
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন ইউক্রেন আক্রমণ করেন, তখন তিনি সম্ভবত ভাবছিলেন যে, আর কয়েকদিনের মধ্যে কিয়েভ দখল করে নেবেন। কিন্তু ইউক্রেনের পাল্টা প্রতিরোধ সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে। কয়েকদিন কিংবা কয়েক মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ার যে যুদ্ধের কথা ছিল, সে যুদ্ধ এখন নতুন নতুন মাইলফলক তৈরি করছে। যুদ্ধ আসলে কখনই কোনো হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সমন্বয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ইরানে হামলা চালানো হয়, তখন কি তারা ভেবেছিলেন, ইরান তাদের এমন নাকানি চুবানি খাওয়াবে!
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ কিছুটা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে আড়ালে নিয়ে গেছে। তবে এর ফলস্বরূপ যুদ্ধ থেমে নেই। বরং গত ১১ জুন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ একটি নতুন মাইলফলক গড়েছে। এই যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্থায়িত্বকালকেও অতিক্রম করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধটি ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই শুরু হয়ে ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত চলেছিল এবং এর মোট স্থায়িত্ব ছিল ১ হাজার ৫৬৭ দিন। বর্তমানে, ১১ জুন পর্যন্ত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ১ হাজার ৫৭০ দিন ধরে চলছে। কিছু কিছু রেকর্ড আমাদের বেদনাহত করে, সভ্যতাকেই হুমকি দেয়। আধুনিক যুগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সভ্যতার জন্য একদম গ্লানির রেকর্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী যে কোনো যুদ্ধের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া খুবই কষ্টকর। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অনেক সময় ক্ষয়ক্ষতি আড়াল করা হয় এবং কখনও কখনও বাড়িয়ে কথাও বলা হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। বরং এই যুদ্ধ সামগ্রিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বিপর্যয়।
আরও পড়ুন: মিশিগানে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে প্রতিবেশীদের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন
সর্বশেষ আন্তর্জাতিক রিপোর্ট এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে মোট আর্থিক ক্ষতি ও ব্যয়ের পরিমাণ ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। যদিও আর্থিক ক্ষতির চেয়ে বড় বিষয় হলো মানুষের প্রাণ। বিভিন্ন সূত্র থেকে দেখা যায়, এই যুদ্ধে এখনও পর্যন্ত ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও আহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছাড় দিলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২০ লাখের বেশি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সাথে বাংলাদেশের কোনও সরাসরি সম্পর্ক নেই। তারপরও এই যুদ্ধে অন্তত ৪০ জন বাংলাদেশী তরুণ প্রাণ হারিয়েছে। উন্নত জীবনের আশা নিয়ে দালালদের খপ্পরে পড়ে বাংলাদেশ থেকে তরুণরা রাশিয়ায় গিয়েছিল।
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাদের অনেককে জোরপূর্বক ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠানো হয়। এভাবে কোনো কারণ ছাড়ায় বাংলাদেশি তরুণরা ইউক্রেন ফ্রন্টে প্রাণ হারাচ্ছে। যুদ্ধের পাশাপাশি যুদ্ধ থামানোর জন্য বিভিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের কোন কার্যক্রম কার্যকর হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আশায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা করেছিলেন।
ট্রাম্পও নোবেল পুরস্কার পাননি এবং যুদ্ধও বন্ধ হয়নি। ট্রাম্প রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেননি, বরং নিজেই নতুন বৃহত্তর এক যুদ্ধে বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা এবং বহু দিক থেকে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির একটি খোলা চিঠি নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করেছে। গত ৪ জুন জেলেনস্কি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে পাঠানো এক খোলা চিঠিতে সুইজারল্যান্ড বা তুরস্কের মতো কোনো নিরপেক্ষ স্থানে পুতিনের সাথে সরাসরি মুখোমুখি বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন। ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্ররাও এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেছেন। তবে পুতিন এই শর্তযুক্ত প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং জানিয়েছেন, যুদ্ধ করেই তিনি তার লক্ষ্য অর্জন করবেন।
এভাবে চলতে থাকলে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সম্ভবত নতুন নতুন গ্লানির রেকর্ড সৃষ্টি করতে পারে। একটি জরিপে দেখা গেছে, ইউক্রেনের অধিকাংশ নাগরিক মনে করেন, আগামী বছরের আগে এই যুদ্ধ থামবে না। এর ফলে বোঝা যাচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্থায়িত্বকালকে ছাড়িয়ে গেছে, বরং এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্থায়িত্বও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আরও পড়ুন: ১০ বছর পর মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে বের হতে পারবে সদস্য দেশগুলো
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন