০২:২৭ এম
ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে কয়েকজন বাংলাদেশিকে মিশরে আটকে রেখে নির্যাতন এবং প্রতারণার অভিযোগের একটি ঘটনা আবারও আলোচনায় এসেছে। আরটিভির মিশর প্রতিনিধি আফছার হোসাইন দু’বছর আগের সেই ঘটনার বিশদ বিবরণ তুলে ধরেছেন।
ঘটনার সম্পর্কে আফছার হোসাইন বলেন, ঠিক দুই বছর আগে এক অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলো। আমি রিসিভ করতেই ওপাশে একজন শক্ত গলায় কাঁদছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কে? কেন কাঁদছেন? তিনি বললেন, আমার নাম আবুল কাসেম। আমি মিশরের আশরা রামাদান থেকে বলছি। আমার বাড়ি কিশোরগঞ্জ। বহু চেষ্টা করে আপনার নম্বর পেয়েছি। আল্লাহর দোহাই লাগে, আমাদের বাঁচান।
আমি জানতে চাইলাম, আপনার কি হয়েছে? তিনি বললেন, আমি কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার সরারচর ইউনিয়ন পরিষদে চাকরি করতাম। নিকলী উপজেলার কারপাশা ইউনিয়ন পরিষদে চাকরি করত মোহাম্মদ শরীফ মিয়া। সেই কারপাশা জালালপুর গ্রামের মিশরে বসবাসরত জহির মিয়া ও মিনা বেগম নামে এক দালাল দম্পতি ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে আমাকে, আবুল কাসেম, মোহাম্মদ শরীফ মিয়া এবং কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা মো. জামান মিয়াকে মিশরে নিয়ে এসেছে। তারা আমাদের প্রায় তিন মাস ধরে একটি ঘরে বন্দি করে রেখেছে।
আরও পড়ুন: নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা
এতে কারপাশা ইউনিয়নের উদ্যোক্তা মোহাম্মদ শরীফ মিয়া’র স্ত্রী ফুলনাহার বেগমের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার কথা বলে আমাদের দালালের বাড়িতে রেখে গৃহকর্ম করানো হচ্ছে। আমরা ৪জন— আমি, আমার বন্ধুর স্ত্রী এবং দুটি বন্ধু। আমাদের দেশে ফিরতে সাহায্য করুন।
আমি বললাম, বাংলাদেশের দূতাবাসে যোগাযোগ করতে। তিনি জানালেন, তাদের কাছে দূতাবাসের কোনো নম্বর নেই এবং নিজেদের ফোনও নেই। তারা অন্য একজনের ফোন থেকে আমাকে কল করেছে।
আমি দালালের নাম এবং ফোন নম্বর চাইলে তিনি সেটা জানিয়ে ফোন কেটে দেন। কিছুক্ষণ পর আমার WhatsApp-এ বাংলাদেশ থেকে সেই দালালের পাসপোর্টের কপি, ছবি, ফেসবুক লিংক এবং আবুল কাসেমের সাথে অন্য একজন ভুক্তভোগীর দুটি ভিডিও পাঠানো হয়। এই ভিডিয়োগুলোতে তাদের অমানবিক এবং অসহায় জীবনযাপনের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছিল।
সেদিন রাতে আমি দালালকে ফোন করে তিনজনের নাম জিজ্ঞাসা করি। প্রথমে তিনি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। পরে স্বীকার করে বলেন, হ্যাঁ, আমি এনেছি এবং গার্মেন্টসে চাকরি দিয়েছি। এরপর উল্টো আমাকে ধমক দিয়ে ফোন কেটে দেন। এরপর যতবার ফোন করেছি, তিনি আর রিসিভ করেননি।
আরও পড়ুন: ধর্মীয় উৎসব শিশুদের নৈতিকতা ও আদর্শের শিক্ষা দেয়: ডেপুটি স্পিকার
পরদিন সকালে আমি বিষয়টি বাংলাদেশে দূতাবাসের তত্কালীন শ্রম কাউন্সিলর ইসমাইল হোসেনকে জানায় এবং দালালের নম্বর দিয়ে আবুল কাসেমদের সহায়তার জন্য অনুরোধ করি।
দূতাবাস থেকে আবুল কাসেমকে যোগাযোগ করে আসতে বলা হলে তিনি জানান, তার ডিউটি রয়েছে আর পরের সপ্তাহে আসবেন। কিন্তু পরের সপ্তাহে তিনি তাঁর স্ত্রীকে পাঠান। দুর্ভাগ্যবশত তিনি শ্রম কাউন্সিলরের সামনে ঘটনার সবকিছু অস্বীকার করেন।
এদিকে আমি কিশোরগঞ্জের কয়েকটি পাবলিক ফেসবুক গ্রুপে দালালের ছবি এবং ঘটনার বিস্তারিত নিয়ে একটি পোস্ট করি। পোস্টটি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মন্তব্য শুরু হয়। সে সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগের একজন নেতা পোস্টটি মুছে ফেলার জন্য আমাকে হুমকি দেন। কিন্তু আমি পোস্টটি সরাইনি।
পরদিন আবুল কাসেম দালালের ফোন থেকে আমাকে কল করে বলেন, স্যার, দালাল বলেছে আগামীকাল আমাদের দেশে পাঠিয়ে দেবে। আপনার কাছে দয়া করে পোস্টটি ডিলিট করার অনুরোধ করছি।
আরও পড়ুন: তালা ভেঙে বাসায় ঢুকে ৮ লাখ টাকা, ২ ভরি সোনা ও মূল্যবান সামগ্রী চুরি: ডেমরায় চাঞ্চল্য
পরবর্তীতে বিমানবন্দর থেকে আবার ফোন করে তিনি জানান, স্যার, আমরা দেশে ফিরে যাচ্ছি। আপনার জন্য আমরা নতুন জীবন পেলাম। আপনি যদি কখনো দেশে আসেন, তাহলে একবার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
কয়েক মাস পর দেশে গিয়েছিলাম। তিনি বারবার মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করেছেন এবং দেখা করার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সময়ের অভাবে দেখা হয়ে ওঠেনি।
আজ (১২ জুলাই) হঠাৎ টাইমলাইনে কাসেম ও তার পরিবারের একটি ছবি চোখে পড়তেই সেই দুই বছর আগের ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। মনে হলো, এই ঘটনাটি আবারও লেখা উচিত— যাতে মানুষ বুঝতে পারে, বিদেশে সুস্পষ্ট জীবন যাপনের স্বপ্ন দেখিয়ে মানব পাচারকারীরা কতটা নিষ্ঠুরভাবে নিরীহ মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। কারণ বিদেশে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে মানব পাচারকারীরা এখনো অসংখ্য নিরীহ মানুষকে প্রতারণার জালে আটকে ফেলছে। অনেকেই অর্থ, সম্মান, স্বাধীনতা এবং কখনো কখনো জীবনও হারিয়ে ফেলছেন।
প্রবাসে যাওয়ার আগে দালাল নয়, যাচাই করা বৈধ পথ বেছে নিন। মনে রাখবেন, একটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধু একজন মানুষের জীবন নষ্ট করে না, পুরো একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে।
আরও পড়ুন: ঢামেকে ভুয়া চিকিৎসক মো. রাকিব আটক, থানায় হস্তান্তর
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন