১১:৫৭ পি.এম
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা সাময়িকভাবে স্তিমিত হলেও যুদ্ধের আগুন যে পুরোপুরি নিভে গেছে, এমনটি মনে করার কোনো সুযোগ নেই। বরং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বক্তব্য, পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি, তুরস্কের ন্যাটোর বৈঠকে ইরানের সাথে করা ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক চুক্তি প্রত্যাখ্যান, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ন্যাটো প্রধানের বার্তা এবং নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত এ অঞ্চলে আরেকটি অস্থির সময়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। এ বাস্তবতায় ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা সময়ের দাবি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গের লক্ষণ ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। যাতে আশংকা তৈরি হয়েছে যেকোনো সময় যুদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে। কারণ হামলা না করার শর্তে উভয় দেশই সম্মত হওয়ার পরেও ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের মাঝেই ইরানে হামলা ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫টি লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের ভয়াবহ পাল্টা হামলাই প্রমাণ করে উভয় পক্ষই আর যুদ্ধবিরতি মানছে না।
ইরানের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, আধুনিক যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হয় না; এটি পরিচালিত হয় গোয়েন্দা অভিযান, লক্ষ্যভিত্তিক হামলা, সাইবার আক্রমণ এবং নেতৃত্বকে অস্থিতিশীল করার বহুমাত্রিক কৌশলের মাধ্যমে। ফলে ইরানের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও সামরিক কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য কর্মসূচি, বড় জনসমাবেশে অংশগ্রহণ কিংবা নিরাপত্তাহীন চলাফেরা এ মুহূর্তে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত অনেক পর্যবেক্ষকের মধ্যেই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান আদৌ কতটা স্থায়ী—সেই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, শক্তিশালী ইসরাইলপন্থী লবির প্রভাব এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার কৌশল যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরায় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
কিন্তু এখানে একটি বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই—ইরান আগের ইরান নয়। গত কয়েক বছরে দেশটি তার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, ড্রোন প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক কৌশলগত প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো বৃহৎ সামরিক অভিযান আর একতরফা বা স্বল্পমেয়াদি হবে বলে ধরে নেওয়া কঠিন। বরং এর প্রতিক্রিয়া সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
যদি আবার কোনো নতুন সংঘাত শুরু হয়, তবে তার প্রভাব শুধু তেহরান, তেল আবিব বা ওয়াশিংটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানও সরাসরি এর দ্বারা প্রভাবিত হবে। বিশেষ করে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে, যেখানে আঞ্চলিক সংঘাত বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থকে সরাসরি স্পর্শ করবে, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও জটিল ও বিপজ্জনক সমীকরণ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সেক্ষেত্রে তুরস্কে ন্যাটো প্রধানের ইরান বিরোধী বক্তব্যের ইঙ্গিত যদি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সমর্থনে হয় এবং বাস্তবে ন্যাটো যদি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে কোনভাবে জড়িয়ে পড়ে তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের স্বার্থ থাকায় সেই স্বার্থ রক্ষার্থে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একক বিশ্ব পরাশক্তির কর্তৃত্ব ধ্বংস করতে অপর বিশাল পরমাণু শক্তিধর পরাশক্তি চীন এবং রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়া কিম্বা তাদের মিত্র শক্তিগুলো যৌথভাবে প্রকাশ্যে যুদ্ধের ময়দানে জড়িয়ে পড়লেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। আর সেটিই হতে পারে বিশ্ব ধ্বংসের তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, ভুল হিসাব-নিকাশ, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস কিংবা প্রতিপক্ষের সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন বড় বড় শক্তিকেও বিপদের মুখে ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতাও সেই শিক্ষার বাইরে নয়। তাই যুদ্ধের ভাষার চেয়ে কূটনীতির ভাষা, সামরিক প্রদর্শনের চেয়ে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং আবেগের চেয়ে দূরদর্শিতাই আজ অধিক প্রয়োজন।
বিশ্ব এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ মুহূর্তেই বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে শুরু হতে পারে বিশ্ব শক্তির লড়াই। তাই মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি নতুন উত্তেজনা কেবল একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র মানবসভ্যতার জন্য উদ্বেগের বিষয়। কারণ আরেকটি বড় যুদ্ধ যদি সত্যিই শুরু হয় আর কোনভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ন্যাটোকে ইরান যুদ্ধে টানতে পারেন, তবে মার্কিন বিরোধী চীন, রাশিয়া, উঃ কোরিয়া ও তাদের মিত্রশক্তি ইরানের পক্ষে না হলেও নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হলে তার আগুনে শুধু কয়েকটি রাষ্ট্রের সীমানাই নয়, পুড়ে যেতে পারে বহু দশকের অর্জিত বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক অগ্রগতির ইতিহাস - যা মানব সভ্যতা ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
