০১:৫৪ পি.এম
পণ্যবাহী জাহাজের নাবিকদের তীরে পৌঁছে দেওয়ার আড়ালে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় চোরাই তেলের কারবার রমরমা চলছে। এই জ্বালানি তেল অবৈধভাবে সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। শুধু এতটুকুই নয়, তেল ক্রয়ের বিনিময়ে জাহাজের মাদকাসক্ত ক্রুদের হাতে ইয়াবাসহ নানান ধরনের মাদকের ছোট-বড় চালান তুলে দেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চোরাই তেলের কারবার পরিচালনার জন্য এই চক্রটি সরকারি সম্পত্তি দখল করে একাধিক অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলছে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড, কিন্তু স্থানীয়দের কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না। এমনকি ঐ নির্দিষ্ট এলাকার সাংবাদিকদের প্রবেশেও রয়েছে সিন্ডিকেটের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালীতে নির্মিত পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা নিয়ে আসে একাধিক লাইটার জাহাজ। পায়রা সমুদ্রবন্দরের আওতাধীন এসব জাহাজ প্রায় প্রতিদিন নির্দিষ্ট জেটি দিয়ে পণ্য খালাস করে। আর এই পণ্য খালাসের আড়ালে চোরাই তেল ও মাদকের বাণিজ্য সম্পন্ন হচ্ছে, যা দীর্ঘ এক মাস ধরে অনুসন্ধানকালে উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন: নেছারাবাদের সমুদয়কাঠী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা মনিরের
প্রত্যক্ষদর্শী ডেভিড (ছদ্মনাম) জানান, স্থলপথে গড়ে ওঠা এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সদস্যরা অভিনব কায়দায় তৈরি ছোট ফাইবার বোটে করে জাহাজের নাবিকদের তীরে পারাপার করে। মূলত এই পারাপারের আড়ালেই চলে মূল চোরাচালান। এসব ফাইবার বোটে বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে তেল মজুতের জন্য আলাদা গোপন কক্ষ বা চেম্বার তৈরি করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে জাহাজ থেকে অত্যন্ত দ্রুত সময়ে কয়েক হাজার লিটার তেল অপসারণ করে তীরে নিয়ে আসা হয়। এরপর বোট থেকে সেই তেল ব্যারেলে ভর্তি করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।
দরের হিসাব অনুযায়ী, জাহাজ থেকে প্রতি লিটার তেল মাত্র ৭০-৮০ টাকা দরে কিনে নেয় কারবারিরা। পরবর্তীতে তা স্থানীয় সিন্ডিকেটের কাছে ১০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।
এই চক্রের সাথে জড়িত কালু মিয়া (ছদ্মনাম) নামের একজন জানান, জাহাজে কর্মরত মাদকাসক্ত অনেক ক্রুকে শুধু টাকা দিয়ে খুশি করা যায় না। তাদেরকে ইয়াবা বা অন্য মাদক সরবরাহ না করলে তারা তেল বিক্রি করতে রাজি হয় না। এর ফলে অসাধু নাবিকদের মাদক সরবরাহ করে তাদেরকে খুশি রাখতে পারলেই বিপুল পরিমাণ চোরাই তেল পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন: মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে বিএনপির পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু
তিনি আরও জানান, স্থলপথে পুলিশি ঝামেলা এড়াতে মাঝেমধ্যে আটক হওয়া তেলের চালানের বিপরীতে নকল কাগজপত্র দেখিয়ে তা ছাড়িয়ে আনা হয়। এছাড়া ঝামেলা এড়াতে সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার মাধ্যমে থানা পুলিশের সাথে মাসিক চুক্তির (মাসোহারা) ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানাচ্ছেন তিনি। খাস জমিতে অবৈধ স্থাপনা তৈরির পাশাপাশি পুরো চক্রের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সরাসরি মদদ রয়েছে।
ক্যাপ্টেন শরীফ (হারবার মাস্টার, পায়রা সমুদ্রবন্দর): "এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। পায়রা বন্দর সীমানায় এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড রোধে কোস্টগার্ডের টহল ও তৎপরতা আরও জোরদার করা হবে। এর পাশাপাশি বন্দর কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে অবহিত করা হচ্ছে।"
মো. আরিফুজ্জামান (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কলাপাড়া): "সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে খতিয়ে দেখা হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অতিদ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
নজরুল ইসলাম (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা - ওসি, কলাপাড়া থানা): "থানা পুলিশের বিরুদ্ধে মাসোহারার যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য। এসব বিষয় মূলত নৌ-পুলিশ এবং কোস্টগার্ডের আওতাধীন। কলাপাড়া থানা পুলিশ পূর্বে কিছু তেল আটক করেছিল, তবে মালিকপক্ষ পরবর্তীতে সেগুলোর বৈধ কাগজপত্র দেখানোর পর তা ছেড়ে দেওয়া হয়।"
আরও পড়ুন: কাউখালী সাপ্তাহিক বাজারে ফুটপাত ও সড়ক দখলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন