০৫:৩২ পি.এম
কৃষিজমি জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, নিচু এলাকার বসতবাড়িগুলো প্লাবিত হচ্ছে। কৃষিকাজ, শিল্পায়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও পটিয়া উপজেলার কর্ণফুলী নদী (শিকলবাহা-মুরালি খাল)-সংলগ্ন এলাকায় এই পরিস্থিতির সমাধানে ১০ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ দেয়াল বা ফ্লাড ওয়াল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
পাউবোর প্রাথমিক কারিগরি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ইউনিয়নের কালারপোল সেতু থেকে ভেল্লাপাড়া সেতু পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এবং পটিয়া উপজেলার কৈয়গ্রাম সেতু থেকে শিকলবাহা-মুরালি খালের উৎসমুখ পর্যন্ত ৬ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ দেয়াল নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে। দুই অংশ মিলিয়ে প্রস্তাবিত দৈর্ঘ্য ১০ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার হবে।
আরও পড়ুন: নড়াইলে অনলাইন প্রতারণা ও জুয়ার অভিযোগে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও একাধিক সিমসহ ৪ জন গ্রেফতার
প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, কারিগরি দিক, ব্যয় ও বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই করার জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্পের প্রস্তাব পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে জোয়ারের পানি থেকে এলাকার সুরক্ষায় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আরো কয়েকটি প্রশাসনিক ধাপ অতিক্রম করতে হবে।
পাউবোর কারিগরি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কর্ণফুলী নদীর বাম তীরে শিকলবাহা ইউনিয়নসংলগ্ন মুরালি বা শিকলবাহা খালটি আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নে সাঙ্গু নদীতে গিয়ে মিশেছে। কর্ণফুলী ও সাঙ্গু নদীর সংযোগকারী এই খালে জোয়ার-ভাটার প্রভাব বিদ্যমান।
জোয়ারের পানি খালের দুই পাশের নিচু এলাকায় প্রবেশ করে জলাবদ্ধতা ও প্লাবন সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে শিকলবাহা ইউনিয়নের ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কালারপোল সেতু থেকে ভেল্লাপাড়া সেতু পর্যন্ত এলাকায় প্রতিদিন জোয়ারের সময় প্রায় ১৫০ হেক্টর জমি প্লাবিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে কৃষিজমির স্বাভাবিক ব্যবহার ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি শিল্পকারখানা ও অন্যান্য বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: পূর্বধলায় মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভা, গঠন হলো নির্মূল কমিটি
অন্যদিকে, পটিয়া অংশের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। কৈগ্রাম সেতু থেকে শিকলবাহা-মুরালি খালের উৎসমুখ পর্যন্ত ৬ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার এলাকায় প্রয়োজনীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ দেয়াল না থাকার কারণে সংলগ্ন কৃষিজমি ও বসতবাড়ি জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পাউবোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এসব জমি কৃষিকাজ ও বিনিয়োগের জন্য পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
পাউবোর নথি অনুযায়ী, পটিয়ার কৈয়গ্রাম থেকে ধলঘাট পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের আওতায় বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে অথবা নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। তবে কৈয়গ্রাম থেকে শিকলবাহা-মুরালি খালের উৎসমুখ পর্যন্ত ৬ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার অংশে বাঁধ না থাকায় সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অর্থাৎ, বিদ্যমান প্রকল্পের আওতায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো গড়ে উঠলেও সংযোগবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বাঁধের ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রস্তাবিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ দেয়াল নির্মাণের মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে, প্রাথমিক কারিগরি প্রস্তাবে ১০ দশমিক ৪৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ দেয়াল, দুই ভেন্টবিশিষ্ট একটি রেগুলেটর এবং ৮ দশমিক ৩৬ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে প্রকল্পের কারিগরি ও প্রশাসনিক দিক অধিকতর যাচাইয়ের জন্য প্রস্তাবটি পাউবোর পরিকল্পনা-১ পরিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে কর্ণফুলীর শিকলবাহা ইউনিয়নের কালারপোল থেকে ভেল্লাপাড়া কোল্ডরোল স্টিল ফ্যাক্টরি পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি আলোচনায় আসে। কারখানাবেষ্টিত ওই এলাকায় প্রচলিত মাটির বাঁধের পরিবর্তে দেয়াল নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে পাউবো জানিয়েছে।
আরও পড়ুন: দুই মাসেও সন্ধান নেই, মেয়ে কিংবা লাশ ফিরে পেতে মায়ের আকুতি
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে শিল্পাঞ্চল ও আশপাশের নিচু এলাকার জোয়ারজনিত প্লাবন থেকে সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা। তবে প্রস্তাবিত দেড় কিলোমিটার অংশের উদ্যোগ এবং বৃহত্তর ১০ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার এলাকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কারিগরি সমীক্ষা ও অনুমোদনের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাউবোর প্রধান প্রকৌশলী, পরিকল্পনা দপ্তর থেকে ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে শিকলবাহা-মুরালি খালের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও নিষ্কাশন উন্নয়ন পরিকল্পনার সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ‘শেরপুর জেলার সমন্বিত নদী, বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা এবং চট্টগ্রাম জেলার শিকলবাহা/মুরালি খালের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও নিষ্কাশন উন্নয়ন পরিকল্পনার নিমিত্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা’ শীর্ষক এ প্রকল্পের প্রস্তাবিত মেয়াদ জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০২৯ পর্যন্ত।
প্রস্তাবিত সমীক্ষায় ভবিষ্যৎ স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও পরিকল্পনাগত বিষয় যাচাই করার কথা রয়েছে। তবে পাওয়া দাপ্তরিক নথিতে সমীক্ষা প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন, মাঠপর্যায়ে সমীক্ষা শুরু কিংবা মূল ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদনের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম ডিভিশন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ জানিয়েছেন, পটিয়া উপজেলার শিকলবাহা/মুরালি খালের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও নিষ্কাশন উন্নয়নসহ ভবিষ্যতে নতুন স্থায়ী প্রকল্প নিতে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প (পিএফএস) প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সমীক্ষা প্রকল্পটি জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০২৯ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য বর্তমানে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
আরও পড়ুন: আজমির উসমানের প্রধান সহযোগী সন্ত্রাসী আক্তার নূর গ্রেপ্তার
নির্বাহী প্রকৌশলী আরো বলেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর প্রাপ্ত সুপারিশের আলোকে পটিয়া উপজেলায় সেচব্যবস্থা ও বেড়িবাঁধ নির্মাণে নতুন টেকসই ও স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন