১২:০৫ পি.এম
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে বজ্রপাতে নিহত সৌদি প্রবাসীর বিধবা স্ত্রী ও চার সন্তানের মানবেতর জীবনযাপন, দেখতে পাচ্ছে না কেউ।
সে পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ডের পশ্চিম ধুলজুরী গ্রামের লিয়াকত আলীর পুত্র প্রবাসী রাসেল মিয়া।
কয়েক মাস কেটে গেছে মৃত্যুর, কিন্তু সরকারি সহায়তার আশ্বাসের বেশিরভাগই গুড়েবালি হয়ে গেছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তি বজ্রপাতে নিহত হওয়ায় তার পরিবারের ওপর পড়েছে অন্ধকার।
আরও পড়ুন: আলেমদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যকারীদের উদ্দেশে রফিকুল ইসলাম মাদানির বিস্ফোরক পোস্ট!
এক সময় যে ব্যক্তি প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারে খাবার জোগাড় করতেন, তার মৃত্যুর পর আজ সেই পরিবারের চুলায় অনেক দিন আগুনই জ্বলে না।
রাসেল মিয়ার স্ত্রী শাহানাজ, চার সন্তানকে নিয়ে একটি ভাঙাচোরা ঘরে অসহায় জীবন কাটাচ্ছেন। পরিবারের কোনো স্থায়ী আয় নাই।
সরেজমিন তথ্য পাওয়া গেছে, রাসেলের স্ত্রী শাহানাজ নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। স্বামীর মৃত্যুতে শোক সামলাতে না সামলাতেই মাত্র ১৬ দিনের মাথায় মারা যান তার মা। জীবনযাত্রার সবচেয়ে কঠিন সময় তিনি হারিয়েছেন একমাত্র আশ্রয়টুকুও।
রাসেলের বৃদ্ধ মা মোমেনা আক্তার ও স্থানীয়দের ভাষ্য, তিন বেলার খাবারের পরিবর্তে অনেক দিন একবেলা খেয়েই তাদের দিন কাটাতে হচ্ছে। সন্তানদের লেখাপড়াও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ তো বাদই দিন, ঠিক মতো খাবার জোগাড় করাও এখন পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: বরিশালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিবিএ আওয়ামী লীগপন্থী নেতা তুহিনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, সুদের কারবার নির্যাতনে দিশেহারা অসহায় মানুষ
গত ১০ মার্চ ২০২৬ সালে সৌদি আরবে কর্মস্থলে মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতে রাসেল মিয়ার মৃত্যু ঘটে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী ও চার সন্তান চরম অনিশ্চয়ের মধ্যে পড়ে গেছে। অপর দিকে পরিবারের অভাব দূর করতে ধারদেনা করে বিদেশে কাজ করছিল রাসেল। কিন্তু সে আশা বর্তমানে বিষাদে রূপ নিয়েছে।
এরপর তিন-চার দিন পরে নিহতের বাড়িতে গিয়ে উপজেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যক্তিরা ঈদ উপলক্ষে জামাকাপড়, খাদ্যসামগ্রী ও কিছু নগদ অর্থ বিতরণ করেছেন। তারা পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে এবং বিভিন্ন সরকারি অনুদানের ব্যবস্থারও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু পরিবারটির অভিযোগ, সেই আশ্বাসের পর দীর্ঘ সময়ে কেটে গেছে, তারা উল্লেখযোগ্য কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। ফলে দিনকে দিন আরো অসহায় হয়ে পড়ছে পরিবারটি।
প্রতিবেশী আবু রায়হান জানান, রাসেল মিয়ার পরিবার বর্তমানে চরম মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং দেশের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলোকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: চৌমুহনী: অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত
এলাকাবাসীর দাবি, সাময়িক সহায়তার পাশাপাশি পরিবারটির জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন, বিধবা ভাতা, শিশুদের শিক্ষা সহায়তা এবং নিয়মিত সরকারি সহযোগিতার ব্যবস্থা করা জরুরি। তাদের প্রশ্ন, একজন প্রবাসী দেশে অর্থনীতি প্রবাহিত করতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পড়ার পর তার অসহায় পরিবার কি এভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকবে?
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহানাজ বলেন, "স্বামী চলে গেছে, তারপর মা-ও মারা গেলেন। আমার মা-বাবা, ভাই-বোন কেউ নেই। চারজন সন্তান নিয়ে কোথায় যাব, কীভাবে বাঁচব জানি না। অনেক সময় সন্তানদের ঠিকমতো খাবারও দিতে পারি না।"
তিনি বলেন, সরকারি সহযোগিতার আশায় আছি, কিন্তু এখনো তেমন কোনো সহায়তা পাইনি।
হোসেনপুর পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মিছবাহ উদ্দিন মানিক বলেন, "রাসেল মিয়ার পরিবার আজ চরম অসহায় অবস্থায় রয়েছে। তারা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষ ও মানবিক সংগঠনের সবাইকে দ্রুত এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানো উচিত। চারটি নিষ্পাপ শিশুর ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।"
আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নারকেল পাড়াকে কেন্দ্র করে কিশোরকে কুপিয়ে হত্যা
একজন প্রবাসীর মৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি প্রাণের অবসান নয়, এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের বাস্তবতা। রাসেল মিয়ার চার সন্তান এখনো অপেক্ষা করছে, তাদের বাবার দেওয়া সেই স্বপ্নগুলো অন্তত রাষ্ট্র ও সমাজের সহযোগিতার মাধ্যমে যেন বেঁচে থাকে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন