১০:৩২ এম
সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে অনেক কিছুর মতো মাদকেরও রূপ, রং ও আদল পাল্টেছে। তবে দেশে প্রচলিত মাদক বলতে সাধারণত বোঝায় হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা অথবা ইয়াবা। সময়ের চাহিদার সাথে সাথে এসব মাদকেও এসেছে পরিবর্তন। ফলে প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি দেশে অনেকটা নীরবে ছড়িয়ে পড়েছে নতুন প্রজন্মের বিচিত্র সব মাদক। এই মাদকের মধ্যে নতুন প্রজন্মের কাছে বেশি পরিচিত সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদক।
নতুন এই মাদকের গড়ন-গঠনও পাল্টে গেছে এবং বর্তমানে এমডিএমবি, আইস, খাথ, এলএসডি, ফেন্টানাইল, ব্ল্যাক কোকেন, এমডিএমএ, ডিএমটি, ডিওবি, ম্যাজিক মাশরুম, কুশ, ট্যাপেন্টাডল, ট্রামাডল ও কিটামিন বিশিষ্ট। নতুন প্রজন্মের মাদকগুলো অনেক বেশি ব্যয়বহুল। ২০১৮ সালের পর থেকে বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এক ডজনের বেশি নতুন প্রজন্মের মাদকের সন্ধান পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা মনে করেন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে তরুণদের মধ্যে নতুন এই মাদকের ব্যবহার বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য নতুন হুমকি হিসাবে দেখানো হচ্ছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মাদকগুলো দেশে অনেকটা নিভৃতে প্রবেশ করছে। আবার নিভৃতেই নতুন প্রজন্মের মাদক দেশের অভ্যন্তরে বাজারও তৈরি করে নিয়েছে। নতুন প্রজন্মের এই মাদকের অন্তত ৯০ শতাংশ অনলাইনে বেচাকেনা এবং টাকা পরিশোধ করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে ডিজিটাল (অনলাইন) মাধ্যমে পরিচালিত 새로운 প্রজন্মের মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে মাদক আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: রূপপুরের জন্য ৪১ টন পারমাণবিক জ্বালানি নিয়ে ঢাকায় রাশিয়ার বিমান
নতুন প্রজন্মের মাদকের বিস্তারের পাশাপাশি পুরনো মাদকের বিস্তারও অব্যাহত রয়েছে। ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, কোকেন এবং ফেনসিডিল জব্দের যে পরিসংখ্যান রয়েছে, তা বলছে এসব মাদকের বিস্তারও আতঙ্কজনক। গত বছর গড়ে প্রতি মাসে ৩৬ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে, অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে ৪০ লাখের বেশি ইয়াবা জব্দ করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। এ ছাড়া গত বছর ১৬৬ কেজি হেরোইন উদ্ধার হলেও চলতি বছরে প্রথম তিন মাসে ৬১ কেজি হেরোইন উদ্ধার হয়েছে। গত বছর ১৪ কেজি ৬০০ গ্রাম কোকেন উদ্ধার হলেও চলতি বছরে প্রথম তিন মাসে ১৬ কেজি কোকেন উদ্ধার করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে ইয়াবা, কোকেন, হেরোইন, গাঁজাসহ প্রচলিত মাদকের প্রবণতা বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যত মাদক উদ্ধার হচ্ছে তার কয়েক গুণ বেশি আইনের ফাঁকফোকর পেরিয়ে চলে যাচ্ছে সেবনকারীদের কাছে।
গত মার্চ মাসে উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। ওই ফ্ল্যাটের ভিতর একটি অস্থায়ী ল্যাবরেটরি পাওয়া যায় যেখানে তরল কিটামিনকে পাউডারে পরিণত করে ব্লুটুথ স্পিকার ও সাউন্ড ইকুইপমেন্টের ভেতরে ঢুকিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছিল। সেখান থেকে ছয় কেজি কিটামিন, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেজিং মেশিন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনে ব্যবহৃত একটি পেনড্রাইভ পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের মাদক এইভাবে রূপান্তর করে মাদকসেবীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের মাদকের বেশির ভাগ ভোক্তা ধনিক শ্রেণির তরুণ প্রজন্ম। এসব মাদক ব্যয়বহুল হওয়ায় তাদের কাছে এটি বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
নতুন প্রজন্মের মাদক বর্তমানে আসছে ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে। পার্সেলে অথবা যাত্রীবেশে মাদক কারবারিরা এসব মাদক দেশে নিয়ে আসছে। সম্প্রতি কয়েকটি অভিযান চালিয়ে এ ধরনের কয়েকজন কারবারিকে আটক করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, এদের মধ্যে বড় একটি অংশ বিদেশি নাগরিক। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) পরিসংখ্যানে নতুন মাদকের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের উদাহরণ খুব বেশি নেই।
আরও পড়ুন: রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্ট সম্পন্ন
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নতুন প্রজন্মের মাদকের বিষয়টি স্বীকার করে জানিয়েছে যে, মাদকপাচারকারী চক্রগুলো এরই মধ্যে সীমান্তভিত্তিক কার্যক্রম ছাড়িয়েছে এবং এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম, ক্রিপ্টোক্যারেন্সি লেনদেন ও ডার্ক ওয়েবের মতো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করছে। এজন্য সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (সংশোধন) ২০২৬-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে সরকার। এতে অনলাইন মাধ্যমে মাদক কারবারের বিরুদ্ধে বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কারণ বিদ্যমান আইনে এ ধরনের অপরাধ মোকাবেলা করা বেশ কঠিন।
প্রস্তাবিত আইনের অনুযায়ী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ, পরিবহন বা বিতরণ করা ফৌজদারি অপরাধ হবে। একই সাথে মাদকপাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ লেনদেনও অবৈধ।
ডিএনসির মতে, মাদক ডিজিটাল মাধ্যমে দেশের ভেতরে প্রবেশ করছে সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নতুন প্রজন্মের মাদকের ‘মিনি ল্যাব’ বা ছোট কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। যেখানে কিটামিনসহ কিছু সিনথেটিক মাদক প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছিল এবং বিদেশি নাগরিকদের একটি চক্রের যোগসাজশে এই কাজটি করা হচ্ছিল।
বর্তমানে কৃত্রিম মাদক বিদেশ থেকে দেশে আসার পাশাপাশি সহজে নির্মাণ হচ্ছে। চক্রগুলো নতুন প্রজন্মের মাদক আইস, এলএসডি, ম্যাজিক মাশরুম এবং পরে এমডিএমবি বাজারজাত করছে। মাদক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রজন্মের মাদকের উদ্বেগজনক একটি দিক হলো দ্রুত আসক্তি তৈরি করা, যা ব্যবহারকারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও পড়ুন: যৌতুকের জন্য স্ত্রী-কন্যা হত্যা মামলায় আবদুর রউফ সরদারের মৃত্যুদণ্ড
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী মামলা নথিবদ্ধ করার সময় গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু এনক্রিপ্টেড অ্যাপ এবং আন্তর্জাতিক পার্সেল সার্ভিসের মাধ্যমে যে সরবরাহ চেইন চলছে সেটা তদারক করছে না।
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক (কৃত্রিম) মাদকের ব্যবহার তরুণদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বাড়ছে এবং এসব মাদক দেশে প্রবেশের তিনটি প্রধান মাধ্যম চিহ্নিত হয়েছে—আন্তর্জাতিক পার্সেল সার্ভিস (ইএমএস, সাধারণ কুরিয়ার), বৈধ ওষুধের সরবরাহ চেইন এবং আন্ত সীমান্ত চোরাচালান চক্র। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এসব সিনথেটিক মাদকের জন্য বোঝা যায়, এই রুটগুলো বেশ পোক্ত হয়ে গেছে। নির্দিষ্ট চেকপয়েন্টে এগুলো আটকানো কঠিন।
ঢাকা বিভাগের গোয়েন্দা শাখার উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান বলেছেন, ‘তিন-চার বছর ধরে বেশ কিছু নতুন মাদক ধরা পড়েছে। এসব মাদক তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে। তারা এগুলো বাইরের দেশ থেকে ডার্কওয়েবে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্ডার করে। এর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে অনলাইন ও বিভিন্ন অনলাইন অ্যাপ। কিছু মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সরকার যদি কঠোর উদ্যোগ না নেয়, তাহলে নতুন মাদক সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদক হয়ে যাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইয়াবার মতো নতুন মাদক ভবিষ্যতে আরো বড় সামাজিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। কারণ এসব মাদক নানা ফাঁকফোকর গলিয়ে সেবীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।’
আরও পড়ুন: এনসিপির ডায়াস্পোরা উপকমিটির নেতৃত্বে আসিফ মাহমুদ ও মনিরা শারমিন
মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলছেন, দেশে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ তরুণ-যুবক আছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এদের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে মাদকাসক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। যদিও এ সংখ্যা নিয়ে সরকারি নির্ভুল জরিপ নেই। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বলছে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘মাদক কারবারি ও সেবীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। একই সাথে নতুন মাদকের প্রতি কঠোর নজরদারি রেখে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’
সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ
আরও পড়ুন: যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনে মালয়েশিয়ায় প্রস্তুতি সভা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন