১০:৩৫ এম
‘মাদক গডফাদাররা আমার ছাত্রদের নষ্ট করে ফেলছে। ছাত্ররা মাদকাসক্ত হয়ে লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়ে পড়ছে। নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। আমি কয়েক দফায় সন্তানতুল্য ছাত্রদের এই মরণনেশা থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেন তাদের ভালো করার চেষ্টা করছি এ জন্য কাউসার নামের এক মাদক গডফাদার আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে।’
এভাবে কথাগুলো বলছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লবীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ একজন শিক্ষক। ওই শিক্ষকের কথার সূত্র ধরে পল্লবী থানা এলাকায় গত দুই দিন সরেজমিনে ঘুরে অনেকের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। ওই এলাকায় অন্তত ২০টি মাদক স্পট রয়েছে। সেখানে একজন মাদক গডফাদার রয়েছেন। তাঁর অধীনে ১৬ থেকে ১৭ জন মাঠ নিয়ন্ত্রণকারী মাদক কারবারি রয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অনেক খুচরা বিক্রেতা। তাঁরা এলাকার বাসাবাড়ির দারোয়ানকেও মাদক বিক্রির কাজে লাগাচ্ছেন। এখান থেকে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাদক কেনার মাধ্যমে জীবন নষ্ট করছে।
পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য বলছে, রাজধানীতে সব ধরনের মাদক কারবারের নেপথ্যে রয়েছেন ২৩১ জন গডফাদার। তাঁদের নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মহানগর পুলিশের আটটি ক্রাইম জোনে রয়েছে কয়েক শ স্পট।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
সহস্রাধিক খুচরা বিক্রেতা মাঠ পর্যায়ে মাদক বিক্রি করছেন। তাঁদের তালিকা করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ডিএমপি সদর দপ্তর সূত্র বলছে, মাদক নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্সনীতি বাস্তবায়নের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। তবে এর পরও অভিযানে প্রত্যাশিত সাফল্য মিলছে না। বিশেষ করে মাদক নিয়ন্ত্রণে থানা পুলিশের কর্মকাণ্ডে শীর্ষ পর্যায়ে অসন্তোষ রয়েছে। মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডে কোনো কর্মকর্তার গাফিলতি পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘রাজধানীতে মাদক নিয়ন্ত্রণে রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। মাদক গডফাদারদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। থানা এলাকায় নিয়মিত মাদক উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়। বেশির ভাগ অপরাধের মূলে এই মাদক।’
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত ১ মে থেকে শুরু হওয়া চলমান বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত ৫২,০৫,৩৩৪ পিস ইয়াবা, ৫৬৮৯.৮৭ গ্রাম হেরোইন, ২০৩৬ বোতল ফেনসিডিল, ৭৭২৫.৭৯ কেজি গাঁজাসহ আরও অন্যান্য মাদক উদ্ধার করা হয়। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি মাদক কারবারিকে।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
তবে এর পরও মাদক কারবার থেমে নেই। রাজধানীর আটটি ক্রাইম জোনের প্রতিটি থানা এলাকায় নিয়মিত মাদক কারবার চলছে। ডিএমপির প্রতিটি থানা এলাকায় ১০ থেকে ১২টি মাদক স্পট রয়েছে। এসব এলাকায় অভিযানে প্রতিদিন শতাধিক সন্দেহভাজন লোককে মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করা হলেও নেপথ্যের শীর্ষ মাদক কারবারি অধরা থেকে যাচ্ছে।
তালিকা ধরে র্যাবের অভিযান
র্যাবের তালিকায় তিন হাজারের বেশি মাদক কারবারি চিহ্নিত হয়েছেন। এর মধ্যে র্যাব-২ এলাকায় ৫৬৫, র্যাব-৪ এলাকায় ৫৩, র্যাব-১ এলাকায় ২২২, র্যাব-৩ এলাকায় ১৩৮, র্যাব-৫ এলাকায় ৩২৮, র্যাব-৬ এলাকায় ১২৯, র্যাব-৭ এলাকায় ১২৩, র্যাব-৮ এলাকায় ৩৬৯, র্যাব-৯ এলাকায় ১২৭, র্যাব-১০ এলাকায় ৬৪, র্যাব-১১ এলাকায় ৪৮, র্যাব-১২ এলাকায় ৩৮২, র্যাব-১৩ এলাকায় ১৬৬, র্যাব-১৪ এলাকায় ২৯৪ এবং র্যাব-১৫ এলাকায় ৮৮ জন রয়েছেন।
সরেজমিন
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশেষ অভিযানের মধ্যেও প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজধানীর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী দফায় দফায় অভিযানের পরও এখনো মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে আসেনি। উল্টো আরো বেড়েছে বলে সেখানকার সাধারণ মানুষ জানিয়েছে। পুলিশের তালিকাভুক্ত গডফাদারদের ঘিরে জেনেভা ক্যাম্পে সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। ক্যাম্পে প্রায়ই মাদক অভিযান হলেও গ্রেপ্তার হন না একাধিক মাদক মামলার আসামি মনু ওরফে গালকাটা মনু, ইমতিয়াজ, শাহ আলম, বিল্লু, সালাম, নেটা সেলিম, ইরফান, লালনসহ আরো অনেকে। তাঁরা প্রকাশ্যে জেনেভা ক্যাম্পে খুচরা মাদক কারবারিদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁদের প্রত্যেকের ৪০ থেকে ৫০ জনের বেশি সহযোগী ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় ঘুরে ঘুরে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করেন।
মোহাম্মদপুর থানার ওসি মেজবাহ উদ্দীন বলেন, ‘জেনেভা ক্যাম্পের মাদক নিয়ন্ত্রণে তাঁরা প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছেন। এ এলাকার গডফাদারদের মধ্যে অনেকে এরই মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষ বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন। যাঁরা গ্রেপ্তার হননি তাঁদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
পুলিশ বলছে, গত এক বছরে মোহাম্মদপুর থানায় যেসব মামলা হয়েছে, এর অন্তত ৬০ শতাংশ মামলা হয়েছে মাদককে কেন্দ্র করে। এসব শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে অনেকে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সরকার পরিবর্তনের পর যৌথ বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তবে বিভিন্ন সময় জামিনে বের হয়ে তাঁদের অনেকে ফের আগের মতো ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা শুরু করেন। এর মধ্যে বুনিয়া সোহেল ৩৬ মামলার আসামি। অন্যদের বিরুদ্ধেও ১০ থেকে ১২টি করে মাদকদ্রব্যসংক্রান্ত মামলা রয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে
আরও পড়ুন: কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে পেলে কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন নেতানিয়াহু?
পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দেওয়া বিভিন্ন সংস্থার সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করে মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে পুলিশের দেওয়া ১৯ হাজার ৪৫ জন সামনের সারির মাদক কারবারির নাম ধরে অভিযান চলছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তালিকায় রয়েছে তিন হাজার ৯৬৪ জন। এ ছাড়া একটি গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় প্রায় ২১ হাজার জনের তথ্য উঠে এসেছে।
শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশেই মাদক গডফাদারদের নিয়ন্ত্রণে চলছে মাদক কারবার। এর মধ্যে টেকনাফে জাহেদ হোসেন, মো. নুর, হারুন অর রশিদ, ফয়েজ আহমদ, জিয়াবুল হক, জাফর আলম ও দিদারুল আলম। কক্সবাজার জেলায় রয়েছেন মো. হাসান, জহরুল ইসলাম, নুরুল আলম, সৈয়দ আলম, বশির আহমদ, আবদুল গফুর, রাশেদুল ইসলাম, আবু জাফর আনসারী, শাহজাহান আনসারী, রশিদ আনসারী, মায়ানমারের নাগরিক আবু নফর (বার্মাইয়া নফর), মো. ইমাম শরীফ, মঞ্জুর আলম (শিয়াল মঞ্জুর), হারুনুর রশিদ লিটন, আবুল কালাম ও আবদুর রহমান। কুমিল্লায় সক্রিয়দের মধ্যে রয়েছেন বোমা আশিক, আবুল কাশেম, মথুরাপুরের মিজান, নুর ইসলাম মো. কাশেম, মো. শফিক মিয়া, হুমায়ুন, বিল্লাল, মো. বাপ্পি, সুজন মিয়া, মোতালেব, মো. ইব্রাহিম খলিল (সজল), মো. সুমন আহম্মেদ, মো. মামুন, মো. ইকবাল হোসেন ও সিরাজ মিয়া। রাজশাহীতে গডফাদারের মধ্যে রয়েছেন টিপু, মো. তোফাজ্জল হোসেন, শীষ মোহাম্মদ, নওশাদ আলী, জিয়ারুল ইসলাম, আবদুল্লাহ, সেতাবুর রহমান বাবু, মীরগঞ্জের মো. ইদ্রিস মোল্লা, ইয়াদুল (ইদুল্লা), আবদুল আলিম (কালু) ও মো. মিলন।
যা বলছেন মন্ত্রী
তরুণদের মাদকমুক্ত রাখতে আইনের পাশাপাশি বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত প্রতিরোধের আহবান জানিয়েছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (আউস্ট) আয়োজনে এবং ঢাকা আহছানিয়া মিশন ও ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব সাবসটেন্স ইউজ প্রোফেশনালস (আইস্যাপ) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সহযোগিতায় গতকাল রবিবার সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. এম এইচ খান মিলনায়তনে ‘তরুণদের মাদক প্রতিরোধে প্রমাণভিত্তিক উদ্যোগ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
আরও পড়ুন: কুড়িগ্রামে দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চার খাদ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
মন্ত্রী বলেন, তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে শুধু ভয়ভীতি বা নিষেধাজ্ঞামূলক প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত উদ্যোগের আহবান জানান তিনি।
মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সমাজকল্যাণমন্ত্রী সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘দেশ মাদকমুক্ত করতে আমাদের সবাইকে মিলে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তাহলে আমরা একটি সুন্দর সমাজ তথা মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন