১০:১৪ এম
প্যারিসের একটি গাছঘেরা সড়কের পাশে ভাঙা দোকানের সারি দেখা যাচ্ছে। দোকানের জানালা ভাঙা অবস্থায় রয়েছে এবং রাস্তায় কাচের টুকরা ছড়িয়ে রয়েছে। দেয়ালে লাল রঙে ফরাসি পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন অপমানজনক কথা লেখা হয়েছে। কিছু জায়গায় দাঙ্গার তারিখও উল্লেখ করা হয়েছে—১৭ অক্টোবর।
বিবিসি জানাচ্ছে, সেখানে দাঁড়িয়ে এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন এলিজাবেথ। শনিবারের সহিংসতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটা ফ্রান্সের আসল চেহারা নয়। সংবাদমাধ্যম শুধু সহিংসতা আর ভাঙচুরের খবর দেখাচ্ছে। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ এমন নয়। এটাই ফ্রান্স নয়।”
এলিজাবেথের কথা বলার সময় আবেগপ্রবণতা স্পষ্ট ছিল। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, শনিবারের ঘটনা ফ্রান্সের মানুষের প্রকৃত অবস্থাকে তুলে ধরছে না। তিনি জানান, তার এক বন্ধু মনে করেন, ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ চলছে। তবে তিনি নিজে তা মনে করেন না। তার মতে, শনিবারের সহিংসতার পেছনে অন্য কারণ রয়েছে।
আরও পড়ুন: আবারও সাংবাদিকের ওপর খেপলেন ট্রাম্প, নেপথ্যে স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই সহিংসতা কারা চালিয়েছে, কেন চালিয়েছে এবং এর পেছনে কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না। কিছু এলাকায় লুটপাটের ঘটনা দেখে মনে হয়েছে, অনেকে সুযোগ পেয়ে দোকানে হামলা চালিয়েছেন। অন্যদিকে, পুলিশের ওপর কিছু হামলা দেখে মনে হয়েছে, সেগুলো আগে থেকেই পরিকল্পনা করে করা হয়েছে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলার পর হঠাৎ কেন এমন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় রাজনৈতিকভাবে কারা লাভবান হতে পারে, তা নিয়েও চলছে আলোচনা। ফ্রান্সের ভেতরে ও বাইরে এ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। তবে একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে দায়ী করে পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন। এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
ফ্রান্সের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের প্রেসিডেন্ট ইয়ায়েল ব্রাউন-পিভে দাঙ্গা এবং এর পেছনে কোনো সংগঠিত পরিকল্পনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে সংসদীয় তদন্তের প্রস্তাব দিয়েছেন। চলতি মাসের শুরুতে ফরাসি গোয়েন্দারা সরকারকে জানিয়েছিলেন, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে বামপন্থী নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠীগুলো জড়িত ছিল। এসব গোষ্ঠীর পরিচিত একটি প্রতীক হলো কালো বৃত্তের মধ্যে ইংরেজি বড় হাতের ‘এ’ অক্ষর। এই সপ্তাহান্তে ফ্রান্সের বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে স্প্রে দিয়ে এমন প্রতীক আঁকা হয়েছে।
শনিবারের একটি ভিডিও ফরাসি সংবাদমাধ্যমে বারবার প্রচার করা হয়েছে। এতে কালো পোশাক পরা একদল তরুণকে দেখা যায়। তাদের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল। ভিডিওতে কয়েকজনকে পুলিশের একাধিক গাড়িতে হামলা চালাতে দেখা যায়। তাদের হাতে বড় হাতুড়ি বা চাপাতির মতো অস্ত্র ছিল বলে মনে হয়েছে।
আরও পড়ুন: এডেন বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, দায় স্বীকার করেছে বিদ্রোহীরা
ফরাসি সংবাদপত্র ‘লে ফিগারো’ ২৯ সেপ্টেম্বরের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু ছাত্রসংগঠন ও উগ্র বামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে পরিস্থিতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, উগ্র বামপন্থী দল লা ফ্রঁস আঁসুমিজ (এলএফআই) ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতাকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। শনিবারের সব সহিংসতার জন্য একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দায়ী করার মতো স্পষ্ট প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার তিন হাজারের বেশি দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব ঘটনার অনেকগুলোই সুযোগসন্ধানী লুটপাট বলে মনে করা হচ্ছে। লুট করা পণ্য বিক্রির জন্য অনেক তরুণ দ্রুত অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেন। এসব পণ্যের মধ্যে নামী ব্র্যান্ডের জুতাও ছিল। কেউ কেউ মুখ না ঢেকেই পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছেন।
এ ঘটনায় অনলাইনে পণ্য বিক্রির বিভিন্ন মাধ্যম ফরাসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে। লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তারা সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছে। পুলিশও বিভিন্ন নজরদারি ক্যামেরার ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজ পরীক্ষা করছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেছেন, সহিংসতা ও চুরির ঘটনায় জড়িত সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
আরও পড়ুন: ডেটা সেন্টার নির্মাণে স্থানীয়দের লভ্যাংশ দিতে আহ্বান ট্রাম্পের
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু পোস্ট মানুষকে সহিংসতায় অংশ নিতে উৎসাহিত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গ্যাব্রিয়েল আতাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কিছু অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ রয়েছে তার। নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতেই তিনি এমন পদক্ষেপের কথা বলেছেন।
ফ্রান্সের পাশাপাশি প্রতিবেশী বেলজিয়ামেও গত কয়েক দিনে সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে। মঙ্গলবার দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাঙ্গার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতাকে ‘টিকটকীকরণ’ হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, এসব ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং সহজে প্রভাবিত হয় এমন অনেক তরুণের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
ব্রাসেলস ও লিয়েজ শহরের সহিংসতার জন্যও তিনি পরিচিত উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছেন। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোরাঁ নুনেজ শনিবারের সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থীদের দায়ী করেছেন। নুনেজের অভিযোগ, এসব গোষ্ঠী পরিস্থিতি আরো খারাপ করছে। তিনি বলেন, তারা ‘আগুনে ঘি ঢালছে’।
মঙ্গলবার লেকর্নু বলেন, উগ্র বামপন্থী ও অতিবামপন্থী ছোট ছোট গোষ্ঠী বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেছিল। এর আগে তিনি অভিযোগ করেন, এসব গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভকে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। তবে বামপন্থী দল এলএফআইয়ের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ এসব অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। তিনিও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান।
আরও পড়ুন: যুক্তরাজ্যে নতুন গ্যাসক্ষেত্রে খননকাজের অনুমোদন, কর্মসংস্থান সুরক্ষার আশা
শনিবারের পরিকল্পিত বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন মেলঁশোঁ। প্রায় এক মাস আগে প্যারিসের সুবিধাবঞ্চিত উপকণ্ঠে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। সবার জন্য উন্নত সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে প্রথম থেকেই তার দলের রাজনীতিকদের দেখা গেছে।
সোমবার প্যারিসের উপকণ্ঠ সাঁ-দেনিতে শিক্ষার্থী সংগঠন এফএসইর সদস্য লিসা কর্দার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের সংগঠনের মাধ্যমে তারা বিক্ষোভের আয়োজন করেন। রাজনীতিকরা শিক্ষার্থীদের দিয়ে এসব করাচ্ছেন অথবা তাদের নির্দেশ দিচ্ছেন—এমন অভিযোগকে অপমানজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। লিসা বলেন, “শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ নিচের স্তর থেকে উঠে এসেছে।”
তার বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের অসন্তোষের নিজস্ব কারণ রয়েছে। তাদের আন্দোলনকে শুধু রাজনৈতিক দলের পরিকল্পনা হিসেবে দেখলে প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যাবে। তবে শনিবারের সহিংসতাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মনে করছেন ফ্রান্সের অনেক মানুষ। এ নিয়ে তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। ২৫ বছর বয়সী লিনা বলেন, “রাজনীতিকরা দোষ চাপানোর জন্য কাউকে খুঁজছেন। কিন্তু কেন এসব ঘটল, তা জানতে চাইছেন না। শনিবারের ঘটনার মূল কারণ কী, সেটি তাঁরা জানতে চান না। আমরা ভীত। নিজেদের অসহায় ও পরিত্যক্ত মনে হচ্ছে।”
শনিবারের পর থেকে ফ্রান্সের শীর্ষ রাজনীতিকরা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন। মাত্র ছয় মাস পর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। এরই মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়ে উঠেছে। রাস্তায় চলমান অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
আরও পড়ুন: সুদান-দক্ষিণ সুদানের বিতর্কিত এলাকায় ড্রোন হামলায় নিহত ৫৩
বর্তমান জনমত জরিপগুলোর বেশ কয়েকটিতে মধ্যপন্থী প্রার্থীদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন মেলঁশোঁ। তিনি প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুকে বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী করেছেন। মেলঁশোঁর অভিযোগ, সরকারের অযোগ্যতার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অথবা সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে দিয়েছে।
তার দাবি, শনিবারের সহিংসতা থামাতে ব্যর্থ হয়ে লেকর্নু নিজেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পক্ষের নেতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন। এর ফলে মানুষ তাকে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উপযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে দেখতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা থেকে মানুষের মনোযোগ সরে যেতে পারে। ফ্রান্স বর্তমানে বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ এবং ঋণ পরিশোধের ব্যয় সামলাতে সমস্যায় পড়েছে।
শনিবারের ঘটনায় গোয়েন্দাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছেন এবং নতুন পুলিশি কৌশল নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ স্বীকার করেছেন, দেশজুড়ে বিক্ষোভের খবর আগে থেকেই জানা থাকলেও রাস্তায় পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়নি। এর আগে বিক্ষোভ দমনে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশকে বেশ অসহায় মনে হয়েছে।
শনিবারের সহিংসতা থেকে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারেন অভিবাসনবিরোধী ন্যাশনাল র্যালি পার্টির নেতা মারিন ল্য পেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জনমত জরিপে তিনি ইতিমধ্যে এগিয়ে রয়েছেন। রবিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেন। ভিডিওতে আনুষ্ঠানিক পোশাকে একটি বড় টেবিলের সামনে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে। পেছনে ছিল ফ্রান্সের পতাকা।
আরও পড়ুন: সৌদির দাবি, ৫ ড্রোন ধ্বংসের মধ্যে ৪টি মদিনার দিকে ছিল
ভিডিওতে ল্য পেন মেলঁশোঁর নাম উল্লেখ করে তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, তাদের উদ্দেশ্য “দেশকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দেওয়া।” ম্যাখোঁর সরকারকেও ব্যর্থ বলে আক্রমণ করেন ল্য পেন। তার ভাষায়, ফ্রান্স এখন “সহিংসতা ও অক্ষমতার মাঝখানে জিম্মি হয়ে পড়েছে।” ভিডিওর শেষে তিনি ভোটারদের মনে করিয়ে দেন, ছয় মাস পর তারা “ভিন্ন পথ বেছে নেওয়ার” সুযোগ পাবেন।
ল্য পেনের দল আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সীমান্ত বন্ধ রাখার পক্ষে প্রচার চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মতো তারাও শনিবারের সহিংসতার জন্য অভিবাসীসহ বিভিন্ন পক্ষকে দায়ী করেছেন। তবে শনিবারের সহিংসতার কারণ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। মার নামে এক শিক্ষক মনে করেন, শনিবারের সহিংসতা রাজনীতিকদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলের সুযোগ করে দিয়েছে। এতে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির আন্দোলন থেকে মানুষের মনোযোগ সরে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের কী প্রয়োজন, শিক্ষকদের কী প্রয়োজন কিংবা ফরাসি জনগণ কী চায়—রাজনীতিকরা তা শুনছেন না। তারা প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য নির্বাচনী প্রচারে সহিংসতাকে ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষকে খারাপ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।” ফ্রান্সের অনেক মানুষের মধ্যে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করছে, ক্ষমতাসীন ও মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সমস্যার সমাধান দিতে পারছে না।
ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এই সপ্তাহান্তে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের পাশাপাশি ইতালি, পর্তুগাল ও আলবেনিয়ায় তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ হয়েছে। কয়েকটি বিক্ষোভে সহিংসতাও ছড়িয়ে পড়ে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি পরিষেবার মান কমে যাওয়া এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অসহায় বোধ করার মতো বিষয়গুলো এসব বিক্ষোভের অন্যতম কারণ।
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের মতো অঞ্চলের যুদ্ধের প্রভাবেও জ্বালানির দাম বাড়ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই বাড়তি ব্যয় কিভাবে সামলানো যাবে, তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ রয়েছে। ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করছে, প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের উদ্বেগের কথা শুনছে না। সমস্যার সমাধানেও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না তারা। তরুণদের উদ্বেগের তালিকায় রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক বৈষম্য, নাগালের বাইরে চলে যাওয়া বাড়ির দাম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের এ বছরের এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ফ্রান্সের ৬৯ শতাংশ মানুষ গণতন্ত্র যেভাবে কাজ করছে, তাতে অসন্তুষ্ট। স্পেনে এ হার ৬৮ শতাংশ এবং ইতালিতে ৬২ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। দেশটির ৬৯ শতাংশ মানুষ গণতন্ত্রের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। শনিবারের দাঙ্গার পর ফ্রান্সে যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের অনেকেই একটি বিষয়ে একমত। তাদের মতে, শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানানো মানুষদের সঙ্গে সহিংসতা ও ভাঙচুরে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের আলাদা করে দেখতে হবে।
কারণ, কোনো দাবির পক্ষে বিক্ষোভ করা আর সেই বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে লুটপাট ও সহিংসতা চালানো এক বিষয় নয়। তবে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক ঘটনা শুধু আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর সঙ্গে মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটও জড়িত থাকতে পারে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণদের বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের অসন্তোষ সেই প্রশ্নকে আরো জোরালো করছে।
মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে এবং অনেকেই মনে করছেন, তাদের কথা শোনার কেউ নেই। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ আরো বাড়তে পারে। ফ্রান্সের সাম্প্রতিক দাঙ্গা তাই শুধু ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা নয়। এটি দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক অসন্তোষ এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলোও সামনে এনেছে। এখন প্রশ্ন, এই ক্ষোভের কারণগুলো চিহ্নিত করে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে কি না। নাকি আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগেই চাপা পড়ে যাবে মানুষের মূল দাবিগুলো?
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন