১০:১৬ এম
প্রায় এক দশকের দীর্ঘ অপেক্ষার পর বোয়িংয়ের সবচেয়ে বড় ৭৩৭ ম্যাক্স মডেল, ম্যাক্স ১০, যাত্রী পরিবহনের অনুমোদন লাভ করেছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন প্রশাসন উড়োজাহাজটিকে এই অনুমোদন দেয়। এর ফলে উড়োজাহাজটির বিক্রি ও সরবরাহের পথে একটি বড় বাধা দূর হলো। তবে, বিমান সংস্থাগুলোর কাছে উড়োজাহাজ সরবরাহ শুরু হতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
বোয়িংয়ের জন্য এই অনুমোদন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নিরাপত্তা, নির্মাণের মান এবং উৎপাদন সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার কারণে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন উড়োজাহাজটির অনুমোদন প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রচেষ্টায় নতুন গতি আনতে পারে।
আরও পড়ুন: কাতারের শান্তি প্রস্তাব নাকচ, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলার শঙ্কা
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ওয়াশিংটনের এভারেট শহরে বোয়িংয়ের উৎপাদনকেন্দ্র পরিদর্শনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি এই অনুমোদনের কথা জানান। তিনি বলেন, "ব্যাপক নিরাপত্তা পর্যালোচনা এবং হাজার হাজার ঘণ্টার পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের পর উড়োজাহাজটি অনুমোদন পেয়েছে।" তার মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাণশিল্পের জন্য একটি বড় অর্জন।
বোয়িংয়ের বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ বিভাগের সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টেফানি পোপ বলেন, "এই অনুমোদনের ফলে এমন একটি উড়োজাহাজ সরবরাহের পথ খুলেছে, যা বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে নতুন মান তৈরি করবে।" তিনি আরও বলেন, "দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল হিসেবে এ অনুমোদন প্রতিষ্ঠানটির পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।"
এক উড়োজাহাজে বেশি যাত্রী
বোয়িংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ম্যাক্স ১০-এ সাধারণত ১৮৫ থেকে ২১০ জন যাত্রী বসতে পারবেন। তুলনায় ম্যাক্স ৯-এ ১৭৫ থেকে ১৯৫ জন এবং ম্যাক্স ৮-এ ১৬০ থেকে ১৮০ জন যাত্রী বহন করা যায়।
আরও পড়ুন: ক্ষমতা হারালেই কি গ্রেফতার হবেন নেতানিয়াহু?
বড় উড়োজাহাজ হওয়ায়, বিমান সংস্থাগুলো একই ফ্লাইটে বেশি যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম হবে। এতে প্রতিটি আসনের বিপরীতে পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। জনপ্রিয় রুটগুলোতে আসনসংখ্যাও বাড়তে পারে। তবে যাত্রীদের টিকিটের দাম কমবে কি না, তা বিমান সংস্থাগুলোর উড়োজাহাজ ব্যবহারের ধরন ও বাজারে প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভর করবে।
বিলম্বে আটকে ছিল হাজারের বেশি উড়োজাহাজের সরবরাহ।
২০১৭ সালে প্যারিসে এক আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ প্রদর্শনীতে ম্যাক্স ১০-এর ঘোষণা দেয় বোয়িং। ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে মডেলটি তৈরি করা হয়। তবে, প্রযুক্তিগত জটিলতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন শর্তের কারণে এর অনুমোদন বারবার পিছিয়ে যায়।
বোয়িংয়ের কাছে এখনো বিশ্বের ৩০টির বেশি গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের জন্য সরবরাহের অপেক্ষায় রয়েছে ১ হাজার ৫৫৫টি ম্যাক্স ১০ উড়োজাহাজ। প্রতিষ্ঠানটির ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের মোট বকেয়া ক্রয়াদেশের ৩০ শতাংশেরও বেশি এই উড়োজাহাজের। এর বড় গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড এয়ারলাইনস, ডেল্টা এয়ারলাইনস, আমেরিকান এয়ারলাইনস ও রায়ানএয়ার। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারিতে আলাস্কা এয়ারলাইনস ১০৫টি ম্যাক্স ১০ কেনার আদেশ দেয়। প্রয়োজনে আরও ৩৫টি কেনার সুযোগও রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আরও পড়ুন: ডিজেল রপ্তানি বাড়াতে চায় ভারত, শোধনাগারগুলো সক্ষমতা বাড়াচ্ছে
দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর নজরদারি।
২০১৮ ও ২০১৯ সালে বোয়িংয়ের ছোট মডেল ম্যাক্স ৮-এর দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ইন্দোনেশিয়া ও ইথিওপিয়ায় মোট ৩৪৬ জন নিহত হন। এসব দুর্ঘটনার পর বোয়িংয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও উড়োজাহাজ তৈরির মান নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।
২০২৪ সালে আলাস্কা এয়ারলাইনসের একটি ম্যাক্স ৯ উড়োজাহাজ আকাশে থাকা অবস্থায় এর গায়ের একটি প্যানেল খুলে পড়ে। এতে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।
দুর্ঘটনাগুলোর পর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন প্রশাসন বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ অনুমোদনের প্রক্রিয়া আরও কঠোর করে। তবে গত ১৮ মাসে প্রতিষ্ঠানটির ওপর আরোপিত কিছু বিধিনিষেধ ধীরে ধীরে শিথিল করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ উৎপাদনের সীমা বাড়ানোও রয়েছে।
আরও পড়ুন: ভারত মহাসাগরে ১৩ দিনের যৌথ মিশনে ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া
চলতি বছরের আগস্টে ম্যাক্স ৭ মডেলটিও বিমান সংস্থাগুলোর ব্যবহারের অনুমোদন পায়। ফলে ম্যাক্স ৭ ও ম্যাক্স ১০—দুটি মডেলের অনুমোদন একই বছরে পাওয়াকে বোয়িংয়ের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
এয়ারবাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা
ম্যাক্স ১০-এর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাসের এ৩২১নিও মডেল। ২০১৭ সালে যাত্রী পরিবহন শুরু করা এই মডেল পরিবারের সবচেয়ে বড় উড়োজাহাজটি ম্যাক্স ১০-এর চেয়ে বেশি যাত্রী বহন করতে পারে এবং জ্বালানি না নিয়েও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে।
তবে পুরোনো উড়োজাহাজের তুলনায় বেশি যাত্রী বহন এবং কম জ্বালানি খরচের লক্ষ্য নিয়ে ম্যাক্স ১০ তৈরি করেছে বোয়িং। জ্বালানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিমান সংস্থাগুলোর কাছে এই বৈশিষ্ট্য আকর্ষণীয় হতে পারে।
আরও পড়ুন: ভারতে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মহড়া চালাতে চায় জাপান
অনুমোদনের অর্থ, উড়োজাহাজটির নকশা নিরাপত্তার নির্ধারিত মান পূরণ করেছে। তবে বোয়িংকে নিশ্চিত করতে হবে, প্রতিটি উড়োজাহাজ অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী তৈরি হচ্ছে। যাত্রী পরিবহনের আগে প্রতিটি উড়োজাহাজকেও আলাদাভাবে ছাড়পত্র নিতে হবে।
এছাড়া জুলাইয়ে ফেডারেল এভিয়েশন প্রশাসন বোয়িংকে উৎপাদনকেন্দ্রেই ম্যাক্স ৭৩৭ ও ৭৮৭ উড়োজাহাজের উড্ডয়নযোগ্যতার সনদ দেওয়ার ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার কথা জানায়। এতে তৈরি হওয়া উড়োজাহাজ উড্ডয়নের উপযোগী কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি আবারও কিছু দায়িত্ব ফিরে পেয়েছে।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
আরও পড়ুন: সংস্কৃতিও যখন নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার: শি চিনপিংয়ের সাংস্কৃতিক তত্ত্বের প্রভাব
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন