০৫:৫৬ পি.এম
ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। গ্রামের সরু রাস্তা ধরে মোটরসাইকেল ছুটছে ধানক্ষেতের দিকে। পেছনে রোদ উঠতে শুরু করেছে এবং সামনে অপেক্ষা করছেন কয়েকজন কৃষক। তাদের জমিতে দেখা দিয়েছে রোগ। দ্রুত সমাধান না পেলে নষ্ট হতে পারে পুরো ফসল। কৃষকদের সেই উৎকণ্ঠার মুহূর্তে ভরসার নাম একজন মানুষ-মফিজ উদ্দিন। তাঁর একটি হাত নেই। জীবনের নির্মম এক দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন ডান হাত। কিন্তু তিনি হারাননি দায়িত্ববোধ, হারাননি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। বরং সেই দুর্ঘটনাই যেন তাকে আরও দৃঢ় করেছে।
তিনি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ব্লকের হাজারো কৃষকের কাছে কেবল একজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নন; তিনি আস্থার প্রতীক ও নির্ভরতার নাম। সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনে অনীহা কিংবা নানা অজুহাতের অভিযোগ যখন প্রায়ই শোনা যায়, তখন শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে মাঠে-মাঠে কৃষি সেবা পৌঁছে দিয়ে তিনি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মফিজ উদ্দিন। কৃষকের সমস্যাই যেন তাঁর নিজের সমস্যা। কোনো কৃষকের জমিতে রোগ দেখা দিলে, ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে অথবা নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার প্রয়োজন হলে সবার আগে যে মানুষটির কথা মনে পড়ে, তিনি মফিজ উদ্দিন।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাস-সিএনজির সংঘর্ষে জুয়েল মিয়া নিহত, আহত ৪
হলিধানী ব্লকে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৫৫৩ জন কৃষক রয়েছেন। তারা ধান, গম, ভুট্টা, বিভিন্ন ধরনের সবজি ও মসলা উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব কৃষকের জন্য সরকারি কৃষি সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। কিন্তু দায়িত্ব তাঁর কাছে কেবল সরকারি চাকরির অংশ নয়; এটি যেন এক ধরনের মানবিক অঙ্গীকার।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালিচরণপুর ইউনিয়নের ছোট মান্দারবাড়িয়া গ্রামের জন্ম মফিজ উদ্দিনের। বাবা মৃত আফসার উদ্দিন জোয়ার্দার। সাত ভাই ও দুই বোনের বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা মফিজ ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামের সঙ্গে পরিচিত। বর্তমানে তিনি দুই কন্যা সন্তানের জনক। শিক্ষাজীবনে ঝিনাইদহ থেকে এসএসসি (ভোকেশনাল) পাস করার পর ফরিদপুর কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন এগ্রিকালচার সম্পন্ন করেন। পরে যশোরে কাজী নজরুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব এডুকেশন (এগ্রিকালচার) ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এসেছিল ২০০৯ সালের ১১ জানুয়ারি। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত অবস্থায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ট্রাকের চাপায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাঁর একটি হাত। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় পুরো জীবন। হাসপাতালে শুয়ে থাকা সেই দিনগুলোতে ভবিষ্যৎ যেন অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল।
পরিবার, স্বপ্ন, কর্মজীবন- সবকিছু নিয়ে তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো তিনি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না। কিন্তু মফিজ উদ্দিন হার মানেননি।
দীর্ঘ চিকিৎসা, সহনীয় শারীরিক কষ্ট আর মানসিক যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে নতুন করে জীবন শুরু করেন। নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিয়ে নয়, বরং তাকে জয় করেই সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ধীরে ধীরে শিখে নেন এক হাত দিয়েই জীবন ও কর্মক্ষেত্রের সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে।
আরও পড়ুন: কেন্দুয়ায় পাচারের সময় ৩২ বস্তা সার জব্দ, চালক পালিয়েছে
সেই দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির ফলেই ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন তিনি। চাকরি জীবনের শুরু যশোরে। পরে বরিশাল ও ফরিদপুরে দায়িত্ব পালন শেষে ২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ব্লকে যোগদান করেন। এরপর থেকে মাঠমুখী কর্মকাণ্ড, কৃষকদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং সমস্যার দ্রুত সমাধান দেওয়ার কারণে অল্প সময়েই কৃষকদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন তিনি।
স্থানীয় কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, "মফিজ উদ্দিনের প্রকৃত অফিস কোনো দালানকোঠা নয়, তার অফিস কৃষকের মাঠ। অনেক সময় সরকারি ছুটির দিনেও কৃষকের ফোন পেয়ে ছুটে যান জমিতে। দিন-রাতের নির্দিষ্ট কোনো কর্মঘণ্টা নেই তার।"
কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, "ধানের জমিতে রোগ দেখা দিলে আগে আমি খুব চিন্তায় পড়তাম। এখন মফিজ ভাইকে ফোন দিলেই চলে আসেন। জমিতে নেমে রোগ শনাক্ত করেন, কী ওষুধ দিতে হবে বলে দেন। এক হাত না থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে তাকে কখনো দুর্বল মনে হয়নি।"
মফিজ উদ্দিন বলেন, "দুর্ঘটনার পর অনেকেই ভেবেছিলেন আমি হয়তো আর কিছু করতে পারব না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, মানুষ চাইলে যেকোনো বাধা অতিক্রম করতে পারে। কৃষকদের জন্য কাজ করার ইচ্ছাটাই আমাকে শক্তি দিয়েছে।
আরও পড়ুন: উখিয়ায় ১৫ ঘণ্টা পরও জ্বলছে গ্যাসের আগুন, ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ
তার মতে, পুরস্কার বা সম্মাননার পরিবর্তে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো কৃষকের মুখের হাসি।
তিনি বলেন, "কোনো কৃষকের ক্ষতি কমলে, ভালো ফলন হলে অথবা তার পরিবারে স্বস্তি ফিরলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।"
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নুর-এ-নবী বলেন, "মফিজ উদ্দিন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার কাজে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তিনি কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আস্থা অর্জন করেছেন। একটি হাত হারিয়ে অনেকেই জীবনযুদ্ধে থেমে যান। কিন্তু মফিজ উদ্দিন প্রমাণ করেছেন, মানুষের শক্তি তার হাতে নয়, তার মনোবলে। তাই ঝিনাইদহের কৃষকদের কাছে তিনি শুধু একজন কৃষি কর্মকর্তা নন; তিনি সাহস, সংগ্রাম, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
আরও পড়ুন: তাহিরপুরে প্রবাসীর স্ত্রী ও পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে উধাও নাজমুল, পরিবার উদ্বিগ্ন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন