১১:৪৬ এম
॥ মোশতাক আহমদ ॥
ঢাকা, ২ অক্টোবর, ২০২৬ : জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান মন্তব্য করেছেন, সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর, টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলকেও দায়িত্বশীল, সংযত ও গণতান্ত্রিক আচরণ প্রদর্শন করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে বর্তমান অবস্থানে এসেছে। এই সাফল্য কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়; এটি সরকারের, বিরোধী দলের এবং জনগণের সম্মিলিত অর্জন। সুতরাং গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে হলে সকলেরই দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: শ্রমিক আন্দোলনে একাত্তর ও চব্বিশের পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্র: রাশেদ খান
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে নিজ কার্যালয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসস’কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেছেন।
হুইপ বলেন, সরকারকে তার ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে এবং বিরোধী দলকেও চেষ্টা করতে হবে।
"আমরা এমন কোনো কাজ করব না, যাতে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়।"
তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার রয়েছে। তবে যদি কোনো কর্মসূচি দীর্ঘ সময় সড়ক অবরোধ, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ব্যাপক বিশৃঙ্খলা বা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ওপর কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ তৈরি হয়। যদি সরকারের পদক্ষেপ মাত্রাতিরিক্ত দমনমূলক হয়ে ওঠে, তাহলেও গণতন্ত্রের জন্য নতুন সংকট সৃষ্টি হতে পারে। তাই উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল হতে হবে, যেন সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
আরও পড়ুন: মিরপুর ১০ নম্বরে যান চলাচল স্বাভাবিক, পুলিশ সতর্ক অবস্থায়
এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেছেন, গণতন্ত্রের বর্তমান যাত্রাকে একটি নবজাতক শিশুর সঙ্গে তুলনা করা যায়। এই শিশুকে সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই এমনভাবে ধারণ করতে হবে, যাতে কোনো পক্ষের আচরণে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার প্রসঙ্গে হুইপ বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের যে সমস্যাগুলো বিদ্যমান, সেগুলো একদিনে কিংবা একটি সংসদের মেয়াদে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়।
তবে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়ন করা গেলে সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হবে।
তিনি বলেন, বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব এবং জুলাই চার্টারের বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে যেখানে ঐকমত্য তৈরি করা সম্ভব, সেখানে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। অক্ষরে অক্ষরে সবকিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলেও বড় বড় জায়গাগুলোতে ঐকমত্য তৈরি করে এগিয়ে যেতে হবে।
আরও পড়ুন: ইউক্রেন যুদ্ধের পর কৃষ্ণসাগরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু
হুইপ বলেন, জুলাই চার্টারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যেসব মতামত দিয়েছে বা যেসব বিষয়ে ভিন্নমত জানিয়েছে, সেগুলোকে সম্মান করেই সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হলেও তা যেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার কারণ না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয়তাবাদ শুধুমাত্র স্লোগান বা বক্তৃতার বিষয় নয়; একজন রাজনৈতিক কর্মীর চিন্তা, আচরণ ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে এর প্রতিফলন ঘটতে হয়।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক চরিত্রের মধ্যে মিল সম্পর্কে তিনি জাতীয়তাবাদ, দেশের স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার এবং রাজনৈতিক সততার বিষয়গুলো উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন, তা হলো দেশের স্বার্থ ও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে দৃঢ়তা। একই ধরনের দৃঢ়তা তিনি তারেক রহমানের মধ্যেও দেখতে পান বলে জানান।
আরও পড়ুন: সৌদিতে হুথিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সৌদি জোটের প্রতিহতের দাবি
হুইপ বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অন্ধ আনুগত্য পছন্দ করতেন না। একজন রাজনৈতিক কর্মীর নিজের নেতার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার অধিকার থাকা উচিত।
তিনি বলেন, ‘আমার কর্মী, আমার কলিগ আমাকে বলবে- আপনার এই বিষয়টি মনে হয় ঠিক হচ্ছে না। যদি ঠিক না হয়, আমি সংশোধন করে নেব। একজন নেতা তার কর্মীদের এ ধরনের মতামত গ্রহণের পরিবেশ তৈরি করবেন-এটাই নেতৃত্বের শক্তি।’
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের সংসদীয় কার্যক্রম সম্পর্কে হুইপ বলেন, অল্প সময়ের পর্যবেক্ষণেই তিনি তাঁর মধ্যে সংসদের প্রতি আগ্রহ, ধৈর্য ও দায়িত্ববোধ লক্ষ্য করেছেন।
তিনি বলেন, সংসদে একজন নেতার সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও অন্যরা নানা সমস্যা নিয়ে দেখা করতে আসেন। ব্যস্ততার মধ্যেও সংসদ নেতা বিরক্তি প্রকাশ করেন না, এটি একটি অসাধারণ গুণ।
আরও পড়ুন: ঢাকায় ২৪ ঘণ্টার অভিযানে ৪০৫ জন গ্রেপ্তার
হুইপ নিজান বলেন, সংসদ সদস্যদেরও সময় ও পরিস্থিতি বুঝে নেতার সঙ্গে দেখা করা উচিত। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, স্পিকার বা বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে আলোচনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়ে আলোচনা চলাকালে ব্যক্তিগত বা স্থানীয় সমস্যা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে দেখা করতে না যাওয়াই সংসদীয় শিষ্টাচারের অংশ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংসদে উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংসদকে কার্যকর করতে শুধু নিয়ম রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়; সংসদের প্রতি আন্তরিক আগ্রহ ও ভালোবাসা প্রয়োজন। সংসদ নেতা তারেক রহমান পার্লামেন্টকে ভালোবেসে ফেলেছেন। এটি গণতন্ত্রের জন্য একটি শুভ যাত্রা।
রাজনৈতিক নৈতিকতা প্রসঙ্গে হুইপ বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামের সময় অনেক রাজনৈতিক কর্মী ত্যাগ শিকার করেন। কিন্তু আন্দোলন সফল হওয়ার পর ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে সেখানেই একজন রাজনৈতিক কর্মীর প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয়।
তিনি বলেন, কেউ যদি ক্ষমতা বা প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে রাজনৈতিক আদর্শ ও বাস্তব আচরণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। দখল, কালোবাজারি, মাদক বা মানব পাচারের মতো কর্মকাণ্ড কোনো রাজনৈতিক দলের ঘোষিত আদর্শের অংশ হতে পারে না। দলের নেতাকর্মীদের এসব কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে হবে।
আরও পড়ুন: শ্যামনগরে বাস-ইজিবাইকের সংঘর্ষে চালক সাগর আলী নিহত
হুইপ নিজান বলেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শুধু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলেই হবে না; পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতাও থাকতে হবে। নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় জয়-পরাজয় স্বাভাবিক।
কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা চিরকাল ক্ষমতায় থাকবে—এমন ধারণা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, নির্বাচন হবে, সরকার ও বিরোধী দল থাকবে-এটাই গণতন্ত্র। তবে দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা ব্যক্তিদের নিজেদের আচরণের মাধ্যমে সততা ও ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একজন রাজনৈতিক নেতা অন্যদের সৎ থাকার নির্দেশ দিয়ে নিজে অনৈতিক সুবিধা নিলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার না করে জনগণের স্বার্থে পরিচালনা করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মী ও নাগরিক সমাজ—সবাইকে নিজেদের দায়িত্বের জায়গা থেকে সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা যেহেতু স্টিয়ারিং সিটে আছি, আমরা যেহেতু সরকারে আছি, কমান্ডে আছি, পাইলট হিসেবে আছি, আমাদের কোরবানি এখানে সবচেয়ে বেশি থাকতে হবে।
হুইপ বলেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব শুধু সরকার বা সংসদের নয়। বিরোধী দল, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষেরও ভূমিকা রয়েছে। সরকারকে বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলকেও এমন কর্মসূচি থেকে বিরত থাকতে হবে, যা জনজীবন বিপর্যস্ত করে বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে সংসদকে কেন্দ্র করে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা, সংসদীয় শিষ্টাচার, রাজনৈতিক সংযম এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বর্তমান সংসদের সামনে বড় দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে হুইপ নিজান বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, সবকিছু একবারে হবে না। কিন্তু এবার যদি আমরা বড় বড় জায়গায় অগ্রগতি করতে পারি, যদি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে পারি, তাহলে সেটিই হবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ভিত্তি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন