০৯:৪৮ পি.এম
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় অবস্থিত আধুনিক প্রাথমিক শিক্ষার বাতিঘর হিসেবে পরিচিত 'মঙ্গল সুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়'। বর্তমান সরকারের নতুন শিক্ষা কার্যক্রমের সাফল্যের বার্তা ছড়িয়ে বিদ্যালয়টিতে সাফল্যের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে প্রাক-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা কার্যক্রম। এখানে আধুনিক অবকাঠামো এবং তথ্য-প্রযুক্তি সংযুক্ত উপকরণ ব্যবহার করে পাঠদান করা হচ্ছে।
সূত্র অনুযায়ী, উন্নত ও আধুনিক শিক্ষাদানের অনন্য স্বীকৃতিস্বরূপ বিদ্যালয়টি ২০২৪ ও ২০২৬ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। বর্তমানে সরকারের ভিত্তিমূলক শিখন বা FLN (Foundational Literacy and Numeracy) কার্যক্রম বাস্তবায়নেও প্রাথমিক বিদ্যালয়টি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করতে প্রথম ধাপে দেশের তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার 'মঙ্গল সুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়', পাবনার 'ভাঙ্গুরা বোয়ালমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়' এবং গাজীপুরের 'কালিয়াকৈর এলাকার উত্তর দারিয়াপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়' এর মধ্যে অন্যতম। বিদ্যালয়ে আধুনিক ও তথ্য-প্রযুক্তিভিত্তিক পাঠদান করা হচ্ছে।
পড়াশোনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা ও সহ-শিক্ষা কার্যকলাপে অনন্য রেকর্ড গড়ছে। ২০২৩ সালে অল বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থান অর্জন করে বিদ্যালয়টি, এবং ২০২২ সালে শতভাগ বৃত্তি লাভ করে। খেলাধুলার প্রতিযোগিতায় প্রতি বছর উপজেলা ও জেলায় অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে প্রথম স্থান বজায় রাখে। সম্প্রতি ২০২৬ সালে বিভাগীয় পর্যায়ের বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে কলাপাড়ার এই বিদ্যালয়টি বিভাগীয় স্তরে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে, যা পুরো পটুয়াখালী জেলায় প্রথম। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিনোদনের জন্য পিয়ানো, হারমোনিয়ামসহ অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র ও খেলাধুলার সরঞ্জাম রয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি সাধারণ জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধির জন্য বিদ্যালয়ে একটি গ্রন্থাগার স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের বই রয়েছে। শিশু শিক্ষার্থীদের আদর্শিক মনোভাবাপন্ন করে তুলতে বিদ্যালয়ে 'কাব স্কাউট'-এর একটি গ্রুপ রয়েছে, যারা জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে অনন্য সাফল্য দেখিয়েছে। বিগত দশ বছরে শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ডসহ মোট ১০৪টি জাতীয় স্তরের পুরস্কার অর্জন করেছে তারা। গত পাঁচ বছরে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্তরের প্রতিযোগিতায় ১২২টি শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড তারা পেয়েছে। বিদ্যালয়ের সামগ্রিক অর্জন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার স্থানীয় শিক্ষা অঙ্গনে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: ঈশ্বরদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন
মংগলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কলাপাড়া পৌরশহরের এ বিদ্যালয়ের সামনে বায়ান্ন থেকে একাত্তর সাল পর্যন্ত ইতিহাস সংবলিত সব ঘটনার নায়ক ও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ছবি আঁকা রয়েছে। এছাড়াও, শিক্ষার্থীদের আন্দোলিত করার জন্য মীনা-রাজুর কার্টুনের ছবি রয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষে শিশুদের খেলাধুলার সামগ্রী ও লেখাপড়ার সামগ্রিক বিষয়গুলো দেয়ালে আঁকা রয়েছে। জাতীয় ফুল-ফলসহ সব স্তরের শিক্ষা প্রদানের জন্য মাটির তৈরি সামগ্রী থরে থরে সাজানো আছে। শিশুদের খেলার জন্য বিভিন্ন সামগ্রী যেমন স্লিপার, দোলনা, ঘোড়া, হাতি, সিংহ, জিরাফসহ অনেক জীবনযাত্রা বিষয়ক সামগ্রীও রয়েছে। যেন এটি একটি শিশুতোষ শিশুপার্কের মতো মনে হচ্ছে। প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পুরো বই দেয়ালে অঙ্কিত রয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বর্তমানে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গত তিন বছরে শিক্ষার্থীদের এফএলএন কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বাংলা বিষয়ে শতভাগ দক্ষতা অর্জনের পর্যায়ে পৌঁছেছে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সব শ্রেণিতে গণিতে ৯৫% অগ্রগতি বজায় রয়েছে। শিক্ষকেরা নিয়মিত শিখন মূল্যায়ন, পাঠভিত্তিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিখন পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠ, লিখন ও গণনাভিত্তিক দক্ষতার ইতিবাচক বিকাশ ঘটে চলেছে। এছাড়া প্যারেড গ্রাউন্ডে সমবেত কন্ঠে জাতীয় সঙ্গীত ও সমাবেশ আয়োজনের দেখা যায়। ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে শিশুরা নিজেদের শ্রেণিকক্ষে ছুটে যায়। তৃতীয় শ্রেণির কক্ষে শিক্ষক প্রবেশ করলেই শিক্ষার্থীরা সমস্বরে অভিবাদন জানায়। শিক্ষক কুশল বিনিময় করার পর প্রজেক্টরের মাধ্যমে সাদা পর্দার ওপর মাল্টিমিডিয়ার রশ্মি ছেড়ে দেওয়া হয়। ল্যাপটপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত প্রাথমিক বিজ্ঞান বইয়ের ১০ অধ্যায়ের 'প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয়' বিষয়ের একটি ভিডিও দেখানো হয়। এরপর মাল্টিমিডিয়ার আলোক রশ্মি বন্ধ করে ভিডিওর খুঁটিনাটি বিষয় পুনঃআলোচনা করা হয়। শিক্ষার্থীদের বলতে বলা হয় ভিডিওতে দেখা বিষয়াবলি দলগতভাবে আলোচনা করার জন্য। পরবর্তীতে শিক্ষকদের কাছে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর ল্যাপটপের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। এই পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম চমৎকারভাবে পরিচালিত হচ্ছে। পাশের কক্ষে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছিলেন এক সহকারী শিক্ষক। তিনি পড়াচ্ছিলেন 'এ ফর অ্যাপল, বি ফর বল' ইত্যাদি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোসা, নাজমুস সাকিব খান কনা বলেন, 'এই বিদ্যালয়টি ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৯৫ সালে এটি 'আদর্শ বিদ্যালয়' হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং ২০০৫ সালে 'মডেল বিদ্যালয়' হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ মোট ১৬ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। শিক্ষার্থী সংখ্যা ৭৬৮ জন, যার মধ্যে বালক ৩৪৫ জন এবং বালিকা ৪২৩ জন। ভিত্তিমূলক শিখন নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। নিয়মিত মূল্যায়ন ও অভিভাবকদের সহযোগিতার কারণে শিক্ষার্থীরা দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করছে। ভবিষ্যতেও এই সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর।'
কলাপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসা. শাহিদা বেগম বলেন, FLN কার্যক্রমসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে কলাপাড়ার মঙ্গল সুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সফলভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা, ওই বিদ্যালয়ের সফলতার মাধ্যমে সরকারের আধুনিক শিক্ষা কার্যক্রম আরো ব্যাপকভাবে সফল হবে।
আরও পড়ুন: জামিনে মুক্ত হয়ে শ্বশুরবাড়িতে পুলিশকন্যা তাসনিয়া রানা তামান্না
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন