১২:৩৭ পি.এম
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ট্রাম্প প্রশাসনকে একটি সতর্কবার্তা প্রদান করেছে, যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন, যা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তিচুক্তি করার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে। বর্তমান এবং সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, নেতানিয়াহু বর্তমানে দেশের ভেতরে প্রবল রাজনৈতিক চাপের সম্মুখীন হয়েছেন।
এই চাপের কারণে তিনি লেবাননে চলমান যুদ্ধ অব্যাহত রাখার দিকে ঝুঁকতে পারেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উদ্যোগ জটিল হয়ে পড়তে পারে। মার্কিন গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথে নতুন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
কর্মকর্তাদের মতে, প্রকাশিত প্রতিবেদনের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা মূল্যায়নে দেখা গেছে, ইসরায়েল লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে, এই পদক্ষেপ নবগঠিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত লঙ্ঘন করবে, যেখানে লেবাননে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: পাক সেনাপ্রধানের ভারত সমর্থিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি
মার্কিন কর্মকর্তারা স্বরাষ্টে বলেছেন, ইসরায়েলের এই অবস্থান আঞ্চলিক উত্তেজনাকে বাড়িয়ে দিতে পারে এবং যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে নেওয়া কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এই মূল্যায়ন এমন একসময়ে এসেছে, যখন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে এমন কোনো সামরিক হামলা চালানোর বিষয়টি যাতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তবে, ইসরায়েলের বর্তমান অবস্থান ও পদক্ষেপ সম্পর্কে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই বিশ্লেষণটি এমন একসময়ে হওয়ার কথা, যখন নেতানিয়াহুর সরকার এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো হামলা না চালানোর জন্য ইসরায়েলকে বিশেষভাবে সতর্ক করে দিয়েছে, যে কারণে ট্রাম্পের চুক্তিটিকে ব্যাহত করতে পারে।
শুক্রবার, হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলায় চার ইসরায়েলি সৈন্য নিহত হওয়ার পরে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননজুড়ে বিমান হামলা চালায়। সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে শুরু হতে যাওয়া আলোচনা তারা স্থগিত করেছেন।
আরও পড়ুন: কানাডায় দুই শতাধিক বাংলাদেশির ভিসা আবেদনে জালিয়াতির অভিযোগ
মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের, তিনিও তার সফর স্থগিত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যদি লেবাননে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করেন, তাহলে তিনি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির ভিত্তিকেই ঝুঁকির মুখে ফেলবেন না, বরং এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারেন। লেবানন ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের সামান্য মতবিরোধ রয়েছে। ট্রাম্প জানান, তিনি ইসরায়েলি নেতাকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, তিনি নেতানিয়াহুকে বলেছেন, ‘হিজবুল্লাহর কোনো সদস্য কোনো ভবনে ঢুকলেই যেন সেটি ধ্বংস করে না ফেলা হয়।’
প্রতিবেদনটির বিষয়ে অবগত একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে যে আসন্ন শরতের জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে তিনি তার সমর্থকদের কাছে কতটা দৃঢ় অবস্থান দেখাতে পারেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের মতে, নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠদের বোঝাতে চাইছেন যে, তিনি লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করবেন না এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই আরো জোরদার করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় ওই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য দিয়েছেন। একই কারণে সাক্ষাৎকার দেওয়া অন্য কর্মকর্তারাও নিজেদের পরিচয় গোপন রেখেছেন।
একজন বর্তমান ও একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তার মতে, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের শান্তিচুক্তির কিছু শর্ত নিয়ে ইসরায়েল অসন্তুষ্ট। তাদের আশঙ্কা, এই চুক্তি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, হামলার শিকার হলে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে।
আরও পড়ুন: রিয়াদে হুতিদের হামলায় নিহত শাহেদের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে
তাদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এড়ানো এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সরকার যুদ্ধবিরতি বা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারকে রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখতে পারে। একদিকে, একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের একমাত্র লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহর হামলা থেকে ইসরায়েলি নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হিজবুল্লাহ হামাসের সঙ্গে মিলে ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর থেকে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে ইসরায়েলে শক্ত জনসমর্থন রয়েছে।
উত্তর ইসরায়েলে হামলার কারণে ঘরছাড়া হওয়া হাজারো মানুষ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কাছে হিজবুল্লাহকে দমন করার দাবি জানিয়েছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, লেবানন থেকে সেনা সরিয়ে নিলে ভোটাররা এটিকে পরাজয় হিসেবে দেখবেন।
একজন মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ইসরায়েল যদি লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল থেকে সেনা না সরায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া নাজুক সমঝোতা ভেঙে পড়তে পারে। এতে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে আবারো যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
এদিকে, ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেছেন, লেবাননের বিরুদ্ধে আরো কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষক হ্যারিসন ম্যান বলেছেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভোটারদের দেখাতে চাইছেন যে তিনি নিরাপত্তা ও যুদ্ধের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে আছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ইসরায়েলের ওপর চাপ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। চাইলে ওয়াশিংটন অস্ত্র, সামরিক সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া সীমিত করতে পারে, যা ইসরায়েলের জন্য যুদ্ধ চালানো আরো কঠিন করে তুলবে। বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, অতীতে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ইসরায়েলের ওপর কিছু চাপ দিলেও কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ খুব কমই নিয়েছেন। তবে তার মতে, হিজবুল্লাহ যদি ইসরায়েলে হামলা চালাতে থাকে, তাহলে ট্রাম্প আপত্তি করলেও নেতানিয়াহু পাল্টা জবাব দেবেন।
আরও পড়ুন: সমরকন্দে আধ্যাত্মিক যাত্রার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এমিনি এরদোয়ান
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন