০৬:৫০ পি.এম
লিবিয়ার তবরুক উপকূল থেকে অনিয়মিত পথে গ্রিসে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে রাবারের নৌকায় পাড়ি দিতে ছেয়েছিলেন শতাধিক বাংলাদেশি। কিন্তু তাদের স্বপ্নের ইউরোপযাত্রা মুহূর্তেই পরিণত হয় জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে। তারা মৃত্যুর মুখোমুখি হন প্রচণ্ড ঝড়, উত্তাল সমুদ্র, নৌকায় পানি প্রবেশ ও ইঞ্জিন বিকল হওয়ার কারণে।
গত ১৪ই সেপ্টেম্বর পৃথক তিনটি নৌযান থেকে বিপদাপন্ন অবস্থায় ১১১ বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধার করে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ। তাদেরকে পরে মিশরের পোর্ট সাঈদ ও দামিয়াত বন্দরে নিয়ে আসা হয়। উদ্ধার হওয়া নাগরিকদের মধ্যে ৫৮ জন পোর্ট সাঈদ নিরাপত্তা কেন্দ্রে এবং ৫৩ জন দামিয়াত নিরাপত্তা কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
শনিবার (৩ অক্টোবর) ও রোববার মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং এর এক কর্মকর্তা দু’দিন ব্যাপী পোর্ট সাঈদ ও দামিয়াত অবস্থান করে তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। তিনি সমুদ্রযাত্রা, বিপদের মুহূর্ত এবং উদ্ধারের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। এ সময় প্রত্যেক নাগরিককে ঐ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মুটোফোন থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: আবুধাবিতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মা-ছেলের শেষকৃত্য সম্পন্ন
পোর্ট সাঈদে থাকা ৫৫ বাংলাদেশি জানান, তারা গত ১৪ সেপ্টেম্বর একটি রাবারের নৌকায় করে গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলেন। যাত্রার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তারা প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়েন। উত্তাল সমুদ্রের মধ্যে প্রায় এক রাত ও এক দিন তাদের নৌযানটি চলতে থাকে। চারদিকে শুধু অন্ধকার পানি আর ভয়াবহ ঢেউ। নৌকাটি উল্টে যাবে কিংবা ডুবে যাবে—এমন আতঙ্কে সময় কাটছিল তাদের। একপর্যায়ে তারা ‘KINGSTON’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজের কাছে সাহায্যের আবেদন করেন। বিপদসংকেত পেয়ে জাহাজটি মিশরের সামুদ্রিক উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তাদের উদ্ধার করে। পরে ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে তাদের পোর্ট সাঈদ বন্দরে নিয়ে আসা হয়।
পোর্ট সাঈদ নিরাপত্তা কেন্দ্রে থাকা আরও তিন বাংলাদেশি জানান, তারা অন্য একটি নৌজানে বাংলাদেশি, মিশরীয় ও সুদানি নাগরিকসহ মোট ৫৬ জন তবরুক থেকে একটি নৌকায় যাত্রা করেছিলেন। সমুদ্রে প্রবেশের পর শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড়। প্রায় দুই দিন তারা উত্তাল সাগরে ভাসতে থাকেন। একপর্যায়ে নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায় এবং নৌকায় ছিদ্র হয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা সাহায্যের জন্য বিপদসংকেত পাঠান। পরে ‘MSC VIRGINIA’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসে। জাহাজটি তিন বাংলাদেশিসহ মোট ১৭ জনকে উদ্ধার করে।
তবে উদ্ধার হওয়া তিন বাংলাদেশির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই নৌকায় থাকা আরও ৩৯ জন যাত্রী ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ রয়েছেন।
দামিয়াতে থাকা ৫৩ বাংলাদেশির অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। তারা জানান, ১৪ সেপ্টেম্বর তবরুক থেকে ৫৩ বাংলাদেশি ও ১৪ সুদানি নাগরিকসহ মোট ৬৭ জন একটি রাবারের নৌকায় যাত্রা করেন। সমুদ্রে প্রবেশের পরই তারা প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়েন। একপর্যায়ে ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করলে নৌকাটি দ্রুত ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। যাত্রীরা আশপাশের বাণিজ্যিক জাহাজ ও সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার জরুরি বিপদসংকেত পাঠাতে থাকেন। ঠিক তখনই ঘটনাস্থলে পৌঁছে নেদারল্যান্ডসের Wagenborg Shipping-এর ‘IJBORG’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ।
আরও পড়ুন: মালয়েশিয়ায় সর্বনিম্ন বেতন ২ হাজার রিঙ্গিত, উপকৃত হবেন প্রবাসীরাও
উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিরা জানান, জাহাজটি যদি আরও আনুমানিক ১০ মিনিট দেরিতে পৌঁছাত, তাহলে নৌকায় থাকা সবাই প্রাণ হারাতে পারতেন। মৃত্যুর এত কাছে গিয়ে ফিরে আসা এসব মানুষ দূতাবাস কর্মকর্তার কাছে নিজেদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। নৌকায় পানি ঢোকা, ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়া, প্রচণ্ড ঝড় এবং উদ্ধার আসতে দেরি হওয়ার আশঙ্কা—প্রতিটি মুহূর্তই ছিল তাদের কাছে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই।
অনেকেই সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, এই উদ্ধার তাদের কাছে নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার মতো।
মিশর গন্তব্য নয়
বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং এর ঐ কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানান, পোর্ট সাঈদ ও দামিয়াতের ১১১জন বাংলাদেশি অভিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব বাংলাদেশি মিশরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রা করেননি। তারা অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশের উদ্দেশ্যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় ভয়াবহ সামুদ্রিক দুর্যোগে পড়েন। পরে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ ও সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক উদ্ধার কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তৎপরতায় প্রাণে বেঁচে মিশরে পৌঁছান।
আরও পড়ুন: থাইল্যান্ডে কৃষি ও নির্মাণ খাতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেবে
তিনি আরও জানান, উদ্ধারপ্রাপ্ত বাংলাদেশিদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় পুলিশ, কারা কর্তৃপক্ষ, ন্যাশনাল সিকিউরিটি, ইমিগ্রেশন সহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে তাদের প্রয়োজনীয় কনস্যুলার ও অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। খুশির খবর হলো এই ১১১জন বাংলাদেশির কায়রো টু ঢাকা টিকেট আইওএম দিতে সম্মতি প্রকাশ করেছে। মিশরের প্রচলিত আইন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের দ্রুততম সময়ে নিরাপদে দেশে ফেরানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এমনকি যাদের কাছে পাসপোর্ট ছিল তাদের বেশ কজন রোববার দেশে ফিরে গিয়েছে। বাকিদের ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করে অচিরেই দেশে পাঠানো হবে।
স্বপ্নের ইউরোপ নাকি মৃত্যুর সমুদ্র?
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অনিয়মিত পথে ইউরোপে যাওয়ার এই ঘটনাগুলো আবারও সামনে এনেছে ভয়াবহ বাস্তবতা। নিরাপত্তাহীন রাবারের নৌকা, বৈরী আবহাওয়া, নৌ-নির্দেশনা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং জরুরি মুহূর্তে উদ্ধার সহায়তা পেতে বিলম্ব—সব মিলিয়ে এ ধরনের যাত্রা যেকোনো সময় ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
দূতাবাসের মতে, মানবপাচারকারী ও অনিয়মিত অভিবাসনে সহায়তাকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে বাংলাদেশিদের এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় যুক্ত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
আরও পড়ুন: বার্সেলোনায় বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ ‘পানসী’র উদ্বোধন, কনসাল জেনারেল প্রশংসা করেন
ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ থেকে ১১১ বাংলাদেশির ফিরে আসা তাই শুধু একটি উদ্ধারকাহিনি নয়—এটি একই সঙ্গে একটি কঠিন সতর্কবার্তা। ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা করা মানুষগুলোর জন্য কয়েক ঘণ্টার সমুদ্রযাত্রাই যে কখনো কখনো জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে শেষ সীমারেখা হয়ে দাঁড়ায়, সেই নির্মম বাস্তবতাই যেন আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এই ঘটনা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন