০৫:২৮ পি.এম
তিনটি আমদানি বিল ও চেম্বারের পাসবই জমার শর্ত নিয়ে বিতর্ক; নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ ঠিকাদারদের
বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনার দরপত্রে তিনটি শর্তকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দরপত্রে পূর্বে পণ্য আমদানির প্রমাণ হিসেবে তিনটি আমদানি বিল এবং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পাসবই জমা দেওয়ার শর্ত রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাঁদের দাবি, এসব শর্তের মাধ্যমে সাধারণ ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ সীমিত করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এ ঘটনায় জেলা সিভিল সার্জন ও বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. সাইয়েদুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী ঠিকাদাররা। তাঁদের দাবি, দরপত্রের শর্ত নির্ধারণ, পণ্যের চাহিদাপত্র ও বাজারদরের তালিকা প্রদর্শন এবং অভিযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে।
আরও পড়ুন: সাংবাদিক মুজিব ফয়সলের ভগ্নিপতি ব্যবসায়ী সবুর খানের মৃত্যুতে মাছুদুর রহমান আসলামের শোক প্রকাশ
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। দরপত্রের পূর্ণাঙ্গ নথি, সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ও মূল্যায়নপ্রক্রিয়া পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্যের ভিত্তিতেই এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধপত্র ও যন্ত্রপাতি কেনার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে ই-টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৯ অক্টোবর।
দরপত্রের শর্তাবলি নিয়ে সম্ভাব্য দরদাতাদের আপত্তির প্রধান তিনটি বিষয় হলো—পূর্বে পণ্য আমদানির অভিজ্ঞতার প্রমাণ হিসেবে তিনটি আমদানি বিল জমা দেওয়ার শর্ত, চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পাসবই দাখিল এবং ই-মেইলে কোনো কিছু গ্রহণযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
ঠিকাদারদের প্রশ্ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের সক্ষমতা, পণ্যের মান, আর্থিক সামর্থ্য ও প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের পাশাপাশি এসব শর্ত কেন প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় এর ভিত্তি কী?
আরও পড়ুন: দেশের সেবায় প্রকৌশলী হতে চায় কালকিনির মেধাবী শিক্ষার্থী সূর্য
তাঁদের মতে, সরাসরি আমদানির অভিজ্ঞতা না থাকলেও বৈধ আমদানিকারক বা অনুমোদিত সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে মানসম্মত চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে সক্ষম প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে। তাই কেবল পূর্ববর্তী আমদানি বিলের ভিত্তিতে যোগ্যতা নির্ধারণ করা হলে সম্ভাব্য সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দরপত্রের শর্ত নিয়ে আপত্তির পাশাপাশি পণ্যের চাহিদাপত্র ও বাজারদরের তালিকা দেখতে না দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।
তাঁদের দাবি, তালিকাটি দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সন্তোষজনক তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি তালিকাটি গায়েব করে ফেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।
আরও পড়ুন: বাকেরগঞ্জে জনসেবায় আলোচনায় দুই বিএনপি নেতা সোহেল-রুবেল
তবে তালিকাটি সত্যিই গায়েব হয়েছে কি না, নাকি অন্য কোনো কারণে তা দেখানো সম্ভব হয়নি, তা সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
ঠিকাদারদের মতে, সরকারি অর্থে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, বাজারদরের তথ্য, হাসপাতালের প্রকৃত চাহিদা এবং ক্রয়সংক্রান্ত নথির যথাযথ সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাজারদরের তালিকা প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন তাঁরা।
দরপত্রে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে শর্ত আরোপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।
তাঁদের দাবি, ASH Prestige Trade, The Professional Business Builders এবং Master Mind Incorporation নামের প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন জেলা সদর হাসপাতালে এককভাবে কাজ পেয়ে আসছে। বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের দরপত্রেও নির্দিষ্ট একটি পক্ষকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
আরও পড়ুন: চাঁদপুরায় মৎস্যজীবী দলের নেতা আলিম সরদারকে মারধরের অভিযোগ
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো যোগসাজশ রয়েছে কি না, কিংবা দরপত্রের শর্ত নির্ধারণে কোনো পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারী ঠিকাদারদের দাবি, বিভিন্ন জেলা সদর হাসপাতালের ক্রয়সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করলে এ বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
দরপত্র মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট কমিটির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
আরও পড়ুন: শতভাগ উৎসব ভাতা ও নতুন পে-স্কেলের দাবিতে সিলেটে শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতিবাদ
তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কমিটির সঙ্গে ডা. আশিক, ডা. রেহেনা ফেরদাউস ও ডা. বলাই কৃষ্ণ বড়াল সংশ্লিষ্ট রয়েছেন।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, দরপত্রের শর্ত নির্ধারণ, পণ্যের চাহিদাপত্র ও বাজারদরের তালিকা প্রদর্শন এবং সম্ভাব্য দরদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
তাঁদের আশঙ্কা, নির্দিষ্ট একটি পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে শর্তগুলো নির্ধারণ করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে দরপত্র প্রস্তুতের নথি, শর্ত নির্ধারণের যৌক্তিকতা, মূল্যায়নপদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: কাঁঠালিয়ার জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের উপহার দিলেন এমপি জামাল
দরপত্রের শর্ত পুনর্বিবেচনা এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে মেসার্স মর্ডান স্কয়ার ও Gulf Security Services (Pvt.) Ltd. নামের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করতে চেয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে সাব্বির হোসেনের দাবি, সরকারি ক্রয়বিধির আলোকে যোগ্য নতুন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের দরপত্রে আরোপিত কয়েকটি শর্ত সাধারণ ঠিকাদারদের অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, “সরকারি গেজেট ও ক্রয়বিধিমালার আলোকে নতুন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকার কথা। কিন্তু দরপত্রে এমন কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ ঠিকাদারদের অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে। আমরা মনে করছি, পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এসব শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।”
সাব্বির হোসেনের আরও অভিযোগ, এ বিষয়ে সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে চাইলে তাঁকে অনলাইনে অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। লিখিত অভিযোগ গ্রহণে সিভিল সার্জন অনীহা প্রকাশ করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে বরিশালের সিভিল সার্জন ও বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. সাইয়েদুর রহমান বলেন, বিশেষ কাউকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দরপত্রে কোনো শর্ত আরোপ করা হয়নি। তাঁর দাবি, দরপত্রের শর্তগুলো বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) বিধিমালার আওতাভুক্ত।
অন্যদিকে, অভিযোগকারী ঠিকাদারদের দাবি, তাঁরা সংশ্লিষ্ট বিধিমালার গেজেটের কপি দেখিয়ে শর্তগুলোর ভিত্তি জানতে চাইলেও তাঁদের নির্দিষ্ট কোনো বিধি বা ধারা দেখানো হয়নি।
দরপত্রের শর্ত ও অভিযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, “আমি একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হলে পুরো বিষয়টি বলতে পারব। ওই সময় পর্যন্ত আপনারা অপেক্ষা করেন।”
অভিযোগকারী ঠিকাদারদের দাবি, দরপত্রের তিনটি শর্তের বিধিগত ভিত্তি প্রকাশ, বাজারদরের তালিকা-সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বর্তমান দরপত্র বাতিল করে বিধিসম্মতভাবে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটা সরাসরি জনস্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ক্ষেত্রে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, মানসম্মত পণ্য সংগ্রহ এবং যোগ্য সরবরাহকারীদের মধ্যে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তাই দরপত্রের শর্ত নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই এবং কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিতর্কের অবসান দাবি করছেন সাধারণ ঠিকাদাররা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন