১০:৪২ এম
দক্ষিণ কোরিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ও বন্দরব্যবস্থা আধুনিক করার জন্য একটি ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দেশটি ২০৩৫ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ চালকবিহীন স্বয়ংক্রিয় জাহাজ চলাচলের প্রযুক্তি চালুর লক্ষ্যে কাজ করছে। একই সঙ্গে, তারা বিশ্ববাজারে এ ধরনের জাহাজের সর্বাধিক ক্রয়াদেশ অর্জনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এছাড়াও, বন্দরের কাজের উৎপাদনশীলতা ৩০ শতাংশের বেশি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এই পরিকল্পনা ২৮ অক্টোবর অর্থনীতি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রীদের যৌথ বৈঠকে ঘোষণা করা হয়, যা দক্ষিণ কোরিয়ার সমুদ্র ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সম্পন্ন হয়। পরিকল্পনার নামকরণ করা হয়েছে ‘সমুদ্র ও মৎস্য খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রূপান্তর কৌশল’।
এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য চারটি খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। এই খাতগুলো হলো জাহাজ চলাচল ও সামুদ্রিক কার্যক্রম, বন্দর ও পণ্য পরিবহন, মৎস্য এবং সমুদ্রের পরিবেশ। সরকারের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পাঁচটি কৌশলগত উদ্যোগ এবং ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ কাজ নির্ধারণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: কৃষ্ণসাগর এখন বিশ্বের সর্বাধিক বিপজ্জনক নৌপথ, রাশিয়ার হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ ও নাবিকের প্রাণহানি
সরকারের লক্ষ্য হলো শিল্প ও জ্বালানিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় স্বয়ংক্রিয় জাহাজের বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দেওয়া। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে এ বাজারের আকার ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ চালকবিহীন বা চতুর্থ স্তরের স্বয়ংক্রিয় জাহাজ চলাচলের মূল প্রযুক্তি তৈরি করা হবে। এরপর দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক জলসীমায় এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। ২০৩৫ সালের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার লক্ষ্য হলো এ ধরনের জাহাজের সবচেয়ে বেশি ক্রয়াদেশ পাওয়া।
দক্ষিণ কোরিয়া সমুদ্রপথে দুর্ঘটনা কমানোর জন্যও এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে জাহাজ চলাচলের তথ্য ও সমুদ্রের পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা ও নিরাপত্তার তথ্য জাহাজগুলোকে প্রদান করা হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সমুদ্র দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় ৩০ শতাংশ কমানো।
বিশেষভাবে ছোট জাহাজের ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলায় সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। উত্তর মেরু দিয়ে জাহাজ চলাচলের পথের তথ্য বিশ্লেষণ করা হবে, যা শিপিং কোম্পানি ও পণ্য পরিবহনকারীদের জাহাজ চলাচলের পরিকল্পনা করতে সহায়তা করবে।
বন্দর ও পণ্য পরিবহনের কাজ দ্রুততর করতে সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে বন্দরের উৎপাদনশীলতা ৩০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। এ জন্য ‘ফিজিক্যাল এআই’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। ২০২৯ সালের মধ্যে গোয়াংইয়াং বন্দরে স্বয়ংক্রিয় বন্দরের একটি পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। সেখানে কনটেইনার ওঠানো, নামানো ও এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষায় সফল হলে এসব প্রযুক্তি দেশের বড় বন্দরগুলোতে চালু করা হবে, যার মধ্যে বুসান বন্দরের জিনহে নিউ পোর্টও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
আরও পড়ুন: নারীদের উন্নয়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতায় গুরুত্ব দিচ্ছেন এমিনি এরদোয়ান
বন্দরের কাজ আরো দ্রুত করতে ‘এজেন্টিক এআই’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হবে, যা নিজে থেকেই কাজের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি, বন্দরের বিভিন্ন যন্ত্রপাতির কাজের মধ্যে সমন্বয় করবে। বুসান বন্দরের ‘পোর্ট-আই’ নামের তথ্য প্ল্যাটফর্মকে আরো উন্নত করা হবে। সমুদ্র, বন্দর ও দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহনব্যবস্থার তথ্য একত্রিত করে পরিচালনার জন্য একটি নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করা হবে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হবে।
মৎস্য খাতেও এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট মাছের খামারের ৩ দশমিক ৭ শতাংশ স্মার্ট প্রযুক্তির আওতায় রয়েছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলের উপযোগী মাছ চাষে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।
মাছ ও সামুদ্রিক খাবারের বাজারে দামের ওঠানামা কমানোর জন্যও এ প্রযুক্তি কাজে লাগানো হবে। এআইয়ের মাধ্যমে এসব পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের পূর্বাভাস দেওয়া হবে। মাছ ও সামুদ্রিক খাবার প্রক্রিয়াজাত করার জন্য স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ব্যবহার করা হবে, যা পণ্যের মান ও মূল্য বাড়ানোর প্রত্যাশা করছে সরকার।
সমুদ্রের পরিবেশ রক্ষার কাজেও এআই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে। সমুদ্রে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা দ্রুত শনাক্ত করার জন্য নতুন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা আরো ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা হবে।
আরও পড়ুন: আনোয়ারের উদ্যোগে খুশি মালয়েশিয়ার নারীরা, মাতৃত্বকালীন ছুটির পরও মিলবে আর্থিক সহায়তা
এছাড়াও, সমুদ্রের ভাসমান ও অন্যান্য বর্জ্য শনাক্ত করে সংগ্রহ করার জন্য স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি তৈরি করা হবে। দেশের জলসীমায় অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করা এবং সমুদ্রসম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতেও এআই প্রযুক্তি কাজে লাগানো হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সমুদ্র ও মৎস্যমন্ত্রী হোয়াং জং-উ মন্তব্য করেছেন, "সমুদ্র ও মৎস্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান এবং বিশ্ববাজারে নতুন সুযোগ তৈরিতে এআই বড় ভূমিকা রাখবে।" তিনি আরো বলেন, "স্বয়ংক্রিয় জাহাজ ও এআইনির্ভর আধুনিক বন্দরব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের গতি ও দক্ষতা অনেক বাড়ানো সম্ভব হবে।"
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন