০৮:৪৩ পি.এম
রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে বসবাসরত মধ্য এশিয়ার মুসলিম অভিবাসী ও স্থানীয় মুসলমানদের মধ্যে একটি বিশেষ মানবিক সম্পর্ক বিদ্যমান। কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান ও তুর্কমেনিস্তান থেকে আসা অভিবাসীদের পাশাপাশি রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক লেখককে বুঝিয়েছে—মানুষের প্রকৃত মূল্য সম্পদ দিয়ে নয়, বরং নৈতিকতা, মানবিকতা, বিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে নির্ধারিত হয়।
মস্কোতে অবস্থানকালে লেখকের স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ হয়েছিল। তার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক রুশ নাগরিক বিদেশিদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা ও শীতল মনোভাবও প্রকাশ পায়। তবে এই অভিজ্ঞতার বিপরীতে, স্থানীয় মুসলমান এবং ইসলাম গ্রহণ করা রুশ নাগরিকদের কাছ থেকে লেখক পেয়েছেন আন্তরিকতা ও ভালোবাসা।
রাশিয়ার তাতারস্তান, দাগেস্তান, চেচনিয়া, ককেশাস, ইঙ্গুশেতিয়া ও চুভাশিয়ার মুসলমানদের সঙ্গে লেখকের পরিচয় ঘটে। বিশেষভাবে তাতারস্তানের মুসলমানদের ভূমিকা লেখক উল্লেখ করেছেন। মস্কোতে মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও সমাবেশের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। এসব স্থানে কোরআন ও হাদিস শেখার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি স্বল্প খরচে ধর্মীয় শিক্ষা এবং জুমার নামাজ আদায়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।
আরও পড়ুন: হুতিদের সৌদির আভা বিমানবন্দর ও খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটিতে হামলার দাবি
মস্কোর সবচেয়ে বড় ও পরিচিত মসজিদটি লেখকের কাছে মুসলমানদের মিলনস্থল হয়ে উঠেছিল। সেখানে হিজাব পরা একজন মুসলিম নারী হিসেবে তাকে দেখে অনেকেই প্রথমে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে অভ্যর্থনা জানাতেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও আন্তরিকতার বন্ধনে অচেনা মানুষগুলো ধীরে ধীরে লেখকের আপনজন হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে গড়ে ওঠে পরিবারের মতো সম্পর্ক।
বিশেষ করে মধ্য এশিয়ার অভিবাসী মুসলমানদের সঙ্গে পরিচয় লেখকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলেছে। তাদের একটি বড় অংশ উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান থেকে মস্কোসহ রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে কাজের সন্ধানে আসেন। তাদের জীবনযাপন, সংগ্রাম এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও অন্যের প্রতি সহমর্মিতা লেখককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
সংগ্রামময় অভিবাসী জীবন
মস্কোতে এসব অভিবাসীদের জীবন মোটেও সহজ নয়। উপার্জনের জন্য তাদের নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। কর্মস্থলে রুশ পুলিশের নিয়মিত অভিযান, দীর্ঘ ও কঠিন কর্মঘণ্টা, অনিরাপদ পরিবেশ এবং শারীরিকভাবে কষ্টসাধ্য কাজ তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। তাদের অনেকেই এমন পেশায় নিয়োজিত, যেগুলোকে ‘থ্রি-ডি’ বা নোংরা, কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব কাজে দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত উন্নতির সুযোগও সীমিত।
আরও পড়ুন: সৌদি সীমান্তে হুথিদের একাধিক স্থল অভিযান, নিরাপত্তা উদ্বেগ বৃদ্ধি
এছাড়া রয়েছে পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব। মস্কোতে নিজের জীবন চালানোর পাশাপাশি দেশে থাকা স্বজনদের জন্যও তাদের নিয়মিত অর্থ পাঠাতে হয়। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ রাশিয়ার তীব্র শীত। তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়ার দেশ থেকে আসা এসব মানুষের জন্য মস্কোর কঠোর শীতের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন।
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও লেখক তাদের মধ্যে যে উদারতা ও আন্তরিকতা দেখেছেন, তা তাকে মুগ্ধ করেছে। নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তারা তাকে খাবার দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন, স্নেহ দেখিয়েছেন এবং বিপদের সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিজেদের জীবনেই নানা সংকট থাকা সত্ত্বেও তারা অন্যের প্রতি সহমর্মিতা দেখাতে কার্পণ্য করেননি।
মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে পবিত্র কোরআনের সূরা আনফালের ৬৩ নম্বর আয়াতের কথাও লেখক স্মরণ করেছেন। আয়াতটিতে বলা হয়েছে, মানুষের সব সম্পদ ব্যয় করেও হৃদয়ের মধ্যে এমন ভালোবাসা ও ঐক্য তৈরি করা সম্ভব নয়; আল্লাহই মানুষের অন্তরগুলোকে একত্র করেন। মস্কোর মুসলিম অভিবাসী ও স্থানীয় মুসলমানদের আচরণে লেখক এই শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন দেখেছেন।
এ ছাড়া মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মুমিনদের পারস্পরিক সহমর্মিতা ও ভালোবাসাকে একটি মানবদেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, শরীরের একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে পুরো শরীর জেগে ওঠে এবং জ্বরে আক্রান্ত হয়। মুসলমানদের একে অপরের প্রতি দায়িত্ব ও সহানুভূতির বিষয়টি বোঝাতে এই উপমা দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: জামায়াত ও ভারতের বৈঠক নিয়ে রাশেদ খানের অভিযোগে জয়সোয়ালের মন্তব্য
মস্কোর মুসলমানেরা নিজেদের জীবনসংগ্রামের মধ্যেও এই ভ্রাতৃত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন। তাদের কাছে লেখক নিজেকে বহিরাগত বা অপরিচিত মনে করেননি; বরং পেয়েছেন আপনজনের মতো গ্রহণযোগ্যতা। তাদের ভালোবাসা তাকে অনুভব করিয়েছে—তিনি তাদের কাছে কাঙ্ক্ষিত, স্বাগত ও ভালোবাসার মানুষ।
মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের মাপকাঠি তার অর্থ-সম্পদ নয়। বরং তার চরিত্র, ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধই প্রকৃত পরিচয়। মস্কোর কঠিন বাস্তবতায় মধ্য এশিয়ার মুসলিম অভিবাসী ও স্থানীয় মুসলমানদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও সহযোগিতা লেখককে সেই শিক্ষাই দিয়েছে।
ইসলাম ও ঈমান মানুষের হৃদয়কে একসূত্রে বাঁধতে পারে। জীবনের নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মস্কোর মুসলমানেরা তাঁদের আচরণে সেই ঐক্য, উদারতা ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন।
সূত্র: অস্ট্রেলেশিয়ান মুসলিম টাইমস (এএমইউএসটি)
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের ঘোষণা: ইসরায়েলকে ৪ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন