০২:২৯ পি.এম
নেত্রকোনা শহরকে সাপের মতো পেঁচিয়ে ফেলা মগড়া নদীটি উদ্ধারের জন্য কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বছর বছর দখলে শীর্ণকায় ঐতিহ্যবাহী মগড়া নদী এখন মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। শহরবাসীও এটিকে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত করেছে, যার ফলে বর্ষা মৌসুমে পানিতে ভরলেও তার ব্যবহার উপযোগী নয়। শুকনো মৌসুম আসলে পানিই থাকে না।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে নদী পুনঃজীবিতকরণ প্রকল্প পাস হয়ে গেলেও মেয়াদের অর্ধেক সময় চলে গেলেও কার্যক্রম শুরুই হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, সময়ের মধ্যেই এর কাজ শুরু হবে।
দখলে দূষণের কারণে এক সময়ের খরস্রোতা ঐতিহ্যবাহী মগড়া নদী এখন মৃতপ্রায় অবস্থায় দেখা দিয়েছে। এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল নেত্রকোনা শহর। কিন্তু কয়েক দশক ধরে নদীর দুই পাড়ে দখল করে গড়ে উঠেছে কয়েকশত অবৈধ স্থাপনা।
আরও পড়ুন: নরসিংদীতে কনসার্ট থেকে ফেরার পথে সড়কে ঝরল দুই বন্ধুর প্রাণ
নদীর বুকে ফেলা হচ্ছে বাসাবাড়ি, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ময়লাসহ বিভিন্ন আবর্জনা, যা বর্ষাকালে পানিকে দূষিত করে। এ বিষয়ে দখল উচ্ছেদ এবং খননসহ সৌন্দর্যবর্ধনের দাবি জানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো আন্দোলন করছে, কিন্তু কোনো সরকারই উদ্যোক্তা হয়নি।
বিগত ২০২০ সালের তথ্যে ওয়েবসাইটে ৩১৬টি দখল চিহ্নিত করা হলেও গত ৫ বছরে দখলের সংখ্যা বেড়ে ৫ শতাধিক হয়েছে। সে সময়ের সংশ্লিষ্টরা দেখানোর জন্য কাগজে পত্রে দুই শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদের কথা বললেও বাস্তবে সবগুলোই পুনর্দখলে রয়েছে। কিছু স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হলেও পরে সেগুলো আবার পুরো বিল্ডিংয়ে রূপ নিয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় ও ক্লাবসহ নানা প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি মালিকানাধীন হয়ে শহরের নাগড়া, সাতপাইসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে। শহরের মোট ৬ কিলোমিটার এলাকায় অবৈধ স্থাপনা নিয়ে প্রশাসন দখলদারদের মধ্যে ইঁদুর বিড়াল খেলা চলছে।
বারবার সভা ও সেমিনার আয়োজন করা হলেও তা তালিকা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। সারা দেশে সিএস মূলে আদালতের নির্দেশনা থাকলেও নেত্রকোনায় প্রভাবশালী মহল এর তোয়াক্কা করছে না। এই কারণে প্রশাসন নিস্প্রভ হয়ে পড়েছে।
এদিকে, দশক ধরে নদী পাড়ের বাসিন্দা এবং সচেতন নাগরিক ও পরিবেশবাদীরা নদী উদ্ধার নিয়ে নানা আন্দোলন সংগ্রাম করে নেত্রকোনা মগড়া নদী পুনঃজীবিত করার দাবি জানাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: যশোরে ট্রেনে কাটা পড়ে ৪৫ বছর বয়সী নারীর মৃত্যু
এরই ধারাবাহিকতায় নদী পুনঃজীবিত করার প্রকল্প ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে অনুমোদিত হয়েছে, তবে কাজ এখনও সভা সেমিনারের পর্যায়ে চলছে। ২০২৭ সালের জুনে মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও কাজ শুরু হয়নি।
স্থানীয় বাবন তালুকদার বলেন, ‘শহরের একমাত্র সৌন্দর্য এই নদী। এই নদীর মাধ্যমেই শহরের প্রসার ঘটেছিল। দেশব্যাপী চলাচলের একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌপথ। লঞ্চ, স্টিমার ও পাল তোলা নৌকা দেখে বড় হয়েছি। বর্তমান পরিস্থিতি নদীটি মৃত হয়ে গেছে। এই নদীর দাফন মাত্র বাকি রয়েছে।’
নদীপাড়ের বাসিন্দা অপু সরকার, শুভ বণিক, মুরিদা রহমান জানান, নদী এখন ময়লা আবর্জনার ভাগাড় হয়ে গেছে। এর পানি দুষিত হয়ে গেছে এবং কেউ স্নান বা গোসল করতে পারেনা। শরীরে চুলকানি হয়। অথচ এই নদী ছিল পানির অন্যতম মাধ্যম।
পরিবেশকর্মী মো. অহিদুর রহমান বলেন, ‘এই নদীর মৃত্যু সনদ কে দেবে? বুড়িগঙ্গাসহ অনেক নদীর ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনার মাধ্যমে উচ্ছেদ কার্যক্রম করা হলেও এই নেত্রকোনায় হচ্ছে না। সবাই জানে এখানে বাধা কোথায়। কিন্তু কেউ দখলদারদের বিপক্ষে যায় না। একবার উদ্যোগ নিয়েও সফলতা আসেনি। এখানে দখলদাররা সরকারের তুলনায় কার্যত শক্তিশালী। নদী একটি জীবন্ত সত্ত্বা। যদিও একটি প্রকল্প এসেছে, এখন একটি বছর শেষ। আগামী বছরের জুনে মেয়াদ শেষ হচ্ছে কিন্তু কোনো কাজ শুরু হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের একার দ্বারা সম্ভব নয়। স্থানীয় প্রশাসনের উচ্ছেদ কাজে সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু কবে তা হবে, কেউ জানেনা। আদৌ তারা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে নদীর জীবন ফিরিয়ে আনবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।’
আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কৃষকের লাউবাগানের গাছ কেটে রাতের আঁধারে স্বপ্ন শেষ
এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, দখল চিহ্নিতকরণের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে এবং দ্রুত সময়ে কাজ শুরু হবে।
অপরদিকে, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুখময় সরকার বলেছেন, ‘আদালতে মামলা থাকায় তালিকাসহ অন্যান্য কাজ চলছে। তবে উচ্ছেদ একটি জটিল কাজ, জনপ্রতিনিধিদের নিয়েই কাজ করতে হবে। আমাদের পক্ষে একা করা সম্ভব নয়।’
তিনি জানিয়েছেন, ‘৪৯টি মামলা চলমান রয়েছে, নিস্পত্তির কাজ দ্রুত করা হচ্ছে। অনেকগুলো রায় আমাদের পক্ষে আসার পরও আবার কিছু আপিল হয়েছে। এসব কাজ শেষ করে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি স্টেকহোল্ডার সভা করেই কার্যক্রম শুরু করা হবে।’
পাউবো সূত্রে জানা যায় যে, ৪৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নেত্রকোনা সদর থেকে আটপাড়া পর্যন্ত ৪১ কিলোমিটার খনন কাজ করা হবে। দখলদারদের দায়ের করা মামলা চলমান রয়েছে ৪৯টি।
আরও পড়ুন: সীতাকুণ্ডের সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারের প্রতিবাদে চট্টগ্রামে মানবন্ধন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন