১০:০৯ এম
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং আবাসনসংকটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগাল।
গতকাল শনিবার, এসব দেশের রাজপথে লাখো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। ফ্রান্সে বিক্ষোভের ফলে সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। দেশটিতে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ২০০ জনকে। বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতেও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শনিবার, ফ্রান্সে কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম উত্তাল বিক্ষোভের দিন ছিল। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সেদিন দেশজুড়ে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শিক্ষার্থীদের কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভের পর পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সহিংস গোষ্ঠীগুলো সরকারি ভবন, বিলাসপণ্যের দোকান ও সুপারমার্কেটে হামলা চালায়। পুলিশের গাড়ি ও সদস্যদের ওপরও হামলা হয়।
আরও পড়ুন: কাতারের শান্তি প্রস্তাব নাকচ, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলার শঙ্কা
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানিয়েছেন, বিক্ষোভে ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৫০ জন পুলিশ সদস্য। মধ্য প্যারিসে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের দেখতে গিয়ে তিনি বলেন, “ক্ষয়ক্ষতি আরো বেশি হয়নি, এটাই অলৌকিক ঘটনা।”
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারিস, মার্সেই, নিস, নঁত, বোর্দো, লিমোজ, লিল, তুলুজ ও স্ত্রাসবুর্গে অসংখ্য দোকানে লুটপাট চালানো হয়েছে। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার মন্তব্য করেছেন, রাজধানীর পুরো সড়ক “বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।”
লিমোজ শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ১৪০ বছরের বেশি পুরোনো টাউন হলের বড় অংশ পুড়ে গেছে। মার্সেই ও লিল শহরের টাউন হলে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। লিয়ঁ শহরে বিক্ষোভকারীরা পর্যটন দপ্তরে আগুন ধরিয়ে দেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, এসব ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: ক্ষমতা হারালেই কি গ্রেফতার হবেন নেতানিয়াহু?
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ করছেন। শনিবারের বিক্ষোভে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
পুলিশের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা তাদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছুড়েছেন এবং আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। ব্রাসেলসের পূর্বে অবস্থিত শহর লিয়েজেও বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। তবে এসব বিক্ষোভে কতজন অংশ নিয়েছেন, তা জানায়নি পুলিশ।
ইতালির মিলান ও বোলোনিয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভের পাশাপাশি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। ইতালির পুলিশ জানিয়েছে, কিছু বিক্ষোভকারী পাথর ছুড়েছেন এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। দেশটির সংবাদমাধ্যমের খবরে কয়েকজন আহত ও গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং বড় শহরগুলোতে আবাসনসংকটের প্রতিবাদে মিছিল করেছেন কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার মানুষ। দেশটিতে ২০১৭ সালের পর থেকে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। নতুন চুক্তিতে বাড়ি ভাড়া নেওয়ার খরচও প্রায় একই হারে বেড়েছে।
আরও পড়ুন: ডিজেল রপ্তানি বাড়াতে চায় ভারত, শোধনাগারগুলো সক্ষমতা বাড়াচ্ছে
শুক্রবার পর্তুগালের সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম বলেছেন, “রাস্তায় চিৎকারের কাছে সরকার নতি স্বীকার করবে না।” অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তাঁদের নেতারা সাধারণ মানুষের সমস্যার বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন।
ফ্রান্সের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে বিক্ষোভ
ফ্রান্সের মতো ব্যাপক না হলেও অন্য দেশগুলোর বিক্ষোভ ইউরোপজুড়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করেন প্যারিসের এইচইসি বিজনেস স্কুলের ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ও নীতিবিষয়ক অধ্যাপক আলবের্তো আলেমানো।
আলজাজিরাকে তিনি বলেন, “ফ্রান্স এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। এখন এর বাইরে ছড়িয়ে পড়ারও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।”
আরও পড়ুন: ভারত মহাসাগরে ১৩ দিনের যৌথ মিশনে ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া
আলেমানোর মতে, শনিবারের বিক্ষোভই শেষ নয়। এসব দেশের আরো বিভিন্ন স্থানে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হতে পারে। গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায়ও আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আগামী সপ্তাহে এসব দেশে বিক্ষোভে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।
তবে একই সময়ে বিক্ষোভ হলেও এগুলো কোনো একক আন্দোলন নয় বলে ব্যাখ্যা করেন তিনি। বিভিন্ন দেশের বিক্ষোভের পেছনে কিছু অভিন্ন কারণ রয়েছে। এর মধ্যে আছে শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থের অভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা।
আলেমানো বলেন, ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আগামী ১২ মাসে মহাদেশটিতে জাতীয় নির্বাচনগুলোর একটি নজিরবিহীন ধারাবাহিকতা শুরু হতে যাচ্ছে। এ সময়ে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।
তার মতে, এসব বিক্ষোভ ও গণজমায়েত ইউরোপের রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়ে পরিণত হবে।
আরও পড়ুন: ভারতে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মহড়া চালাতে চায় জাপান
এএম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন