০১:১৪ এম
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আজ রবিবার (৭ জুন) রায় ঘোষণা করবেন ট্রাইব্যুনাল। গত বৃহস্পতিবার, ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে আসামিদের উপস্থিতিতে যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর এ দিন রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করা হয়। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ এ তথ্য নিশ্চিত করেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, আজ নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণার জন্য প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে পুলিশি পাহারায় মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় আনা হবে। সেখান থেকে কিছুক্ষণ পরে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে তাদের নিতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হবে। আলোচিত এবং চাঞ্চল্যকর রায়কে কেন্দ্র করে ঢাকার নিম্ন আদালতে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য পুলিশের বিশেষ ফোর্স মোতায়েন করা হবে বলে আদালতের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় নজিরবিহীন গতিতে মামলাটি বিচারের শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ১৯ মে দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিট অর্থাৎ ২০ মে মামলা দায়েরের পর ৫ দিনের মাথায়, ২৪ মে তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। ওই দিনই ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত বলে মত দেন এবং তা ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই দিন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। এর পর ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হলেও মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির স্বার্থে বিচারিকের ছুটি বাতিল করে এ মামলাটির শুনানির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরে ১ জুন আদালত দুই আসামির উপস্থিতিতে অভিযোগ গঠন করেন। একই সঙ্গে পরদিন, মামলার বাদীসহ ১৮ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়। ২ জুন মামলার বাদীসহ ১৬ জন সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেন। আদালত একদিনেই সাক্ষ্য গ্রহণ এবং জেরা শেষ করেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর বিচারক ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য করেন। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজের দায় স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। অন্যদিকে, তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। শুনানি শেষে বিচারক ৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করেন। ৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুল রহমান দুলু এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মূসা কালিমুল্লাহ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে বিচারক আজকের জন্য রায়ের দিন ধার্য করেন। মামলাটিতে অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং পরবর্তীতে যুক্তিতর্ক শেষে আজ রবিবার রায়ের দিন নির্ধারণসহ সব ক্ষেত্রেই ছিল দ্রুতগতি। আদালত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় এত দ্রুত বিচারিক কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে যাওয়ার নজির দেশে খুব কমই দেখা গেছে। সাধারণত তদন্ত প্রতিবেদন, বিচার শুরু ও সাক্ষ্যগ্রহণের বিভিন্ন ধাপ পার হতে বছরের পর বছর সময় লাগে। সভায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ, আর আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রধান আসামি সোহেল রানার যাবজ্জীবন চান। তবে আসামিপক্ষের দাবি, এ মামলায় সহযোগিতার দায়ে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের সাত বছরের সাজা দেওয়া হোক। রায় ঘোষণার পর সেটি কার্যকর হতে কতদিন লাগতে পারে এ প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু বলেন, সেটি একমাত্র উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত। তিনি জানান, রায়ে আমরা সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডই চাই। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রায় ঘোষণায় ট্রাইব্যুনাল দেবেন। রায় ঘোষণার পরে তা কার্যকর হতে বিলম্ব হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। বিচারিক আদালতে রায়ের পরে একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির উচ্চ আদালতের বিভিন্ন ধাপের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারটিও থাকে। সেক্ষেত্রে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। তিনি আরো বলেন, প্রধান বিচারপতি চাইলে দ্রুত এই রায় কার্যকর করার জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দ্রুত শেষ করতে পারবেন। সেটি একান্তই তার এখতিয়ার। গত বৃহস্পতিবার, যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে এই মামলার রাষ্ট্রপক্ষের পিপি আজিজুর রহমান দুলু আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চান বলে সাংবাদিকদের জানান। তিনি বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে এ মামলায় সম্পূর্ণরূপে সাক্ষ্য প্রমাণ আদালতে প্রমাণ হয়েছে। গত বুধবার, আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানিতে প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজের দোষ স্বীকার করেছেন। সুতরাং আমরা আদালতের কাছে সর্বোচ্চ শাস্তি যেটা মৃত্যুদণ্ড সেটি চেয়েছি। অপরদিকে, আসামিপক্ষের রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মূসা কালিমুল্লাহও আসামি সোহেল নিজের দোষ স্বীকার করে নেওয়ায় তার যাবজ্জীবন চান। অপরদিকে, সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার যেহেতু তাকে এ হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করেছেন এজন্য তাকে ২০১ ধারায় সাত বছর কারাদণ্ড চেয়েছেন আসামিপক্ষের এই আইনজীবী। শুনানি শেষে ব্রিফিংয়ে এসব জানান তিনি। যুক্তিতর্ক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের এই মামলার বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়ে শুনানি করেন। এ সময় তিনি আসামি সোহেল এবং স্বপ্নাকে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ পড়ে শোনান। একই সঙ্গে মামলার বাদী এবং রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার অভিযোগ আদালতে পড়ে শোনান। একইভাবে মামলাটির সকল সাক্ষীদের জবানবন্দি পড়ে শোনান। এ সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের এই পিপি বলেন, মামলার প্রত্যেকটা সাক্ষী রামিসার গলাকাটা লাশ দেখেছেন বলে এখানে জবানবন্দি দিয়েছেন। ডলারের নাম আসার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু বলেন, আসামি জবানবন্দিতে ডলারের নাম বলেনি। এটি মূলত সে যখন অন্যান্য আসামিদের সঙ্গে কারাগারে ছিল, সেখান থেকে অন্যান্য আসামিদের কাছ থেকে এই বুদ্ধি-পরামর্শ পায়। তবে একই সঙ্গে যেটা বলা উচিত, আল্লাহর পক্ষ থেকে আসামি সোহেল কিন্তু স্বেচ্ছায় নিজের দোষ স্বীকার করে মাফ চেয়েছেন। বলা যায়, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে। এই মামলায় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নার সম্পৃক্ততা সম্পর্কে পিপি দুলু আদালতে বলেন, সে (স্বপ্না) কিন্তু রামিসার এই অবস্থা দেখে বাইরে এসে চিৎকার করে জানাতে পারত। কিন্তু তিনি তা করেননি। শুধু সোহেলকে জানালা দিয়ে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন, এমনটি নয়, পুরো ব্যাপারে স্বপ্না সেখানে অবস্থান করে সহায়তা করেছেন। তিনি যদি নিরপরাধ হতেন, তাহলে কাউকে জানাতেন। পিপি তদন্ত কর্মকর্তার ওইদিনের সিসিফুটেজ না পাওয়ার বিষয়ে আদালতে বলেন, সিসিফুটেজে না পাওয়ার কারণ হচ্ছে, পল্লবী এলাকা এত ডেভলপ হয়নি, এজন্য সিসিফুটেজে পাওয়া যায়নি। বেলা দেড়টা পর্যন্ত একটানা শুনানি করেন রাষ্ট্র পক্ষের পিপি আজিজুর রহমান দুলু। পরবর্তীতে ১টা ৩১ মিনিট থেকে আসামিপক্ষের রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মূসা কালিমুল্লাহ যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু করেন। তিনি আদালতে বলেন, শুধু জবানবন্দির আলোকে চার্জশিট দিয়ে আসামিকে শাস্তি দেওয়া যায় না। একজন নেশাগ্রস্ত আসামি কি জবানবন্দি দিয়েছেন তা গ্রহণ করা যায় না। এটা বলে শুনানি শেষ করেন। পরে পিপি দুলু আসামিপক্ষের আইনজীবী ও আদালতকে বলেন, ঘটনার সময় সোহেল নেশাগ্রস্ত ছিল, সেটা কোথাও প্রমাণিত হয়নি। পরে আসামিপক্ষের আইনজীবীও বিষয়টি মেনে নিলে আদালত রায়ের দিন ধার্য করেন। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ভুক্তভোগী রামিসা আক্তার পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে, আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে তার ফ্ল্যাটের রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে, রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকলে, একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে তার জুতা দেখতে পান। ডাকাডাকির পর কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে, রামিসার বাবা-মা এবং অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করে আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসা আক্তারের মস্তকবিহীন মরদেহ এবং মাথা রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে দেখতে পান। আসামি স্বপ্না আক্তারকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পেয়ে, তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, তার স্বামী, আসামি মো. সোহেল রানা হীন কামনা চরিতার্থ করার জন্য রামিসাকে বাথরুমের ভেতরে আটকে রেখে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে গলা কেটে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা, দুইজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা দায়েরের পর প্রথমে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। একই দিন আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানো হয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন