০৯:৪১ এম
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর নিদাল মালিক হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দৃশ্য সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হবে, এমন তথ্য জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ভারতীয় সংবাদসংস্থা এএনআই নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বৃহস্পতিবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আগামী ৩ ডিসেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুড সেনাঘাঁটিতে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে।
২০০৯ সালে ফোর্ট হুড সেনাঘাঁটিতে গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন হাসান। ২০১৩ সালে সামরিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘রিয়েল আমেরিকা’স ভয়েস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হেগসেথ বলেন, ৩ ডিসেম্বর দুপুর ১টায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর একই সময়ে হাসান ওই হামলা চালিয়েছিলেন।
হেগসেথ জানান, ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে সেনাসদস্যরা হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে হামলা চালানোর পরিণতি জনগণকে বোঝাতে এই মৃত্যুদণ্ড প্রকাশ্যে দেখার ব্যবস্থা করা হবে।
আরও পড়ুন: গাজায় ইসরাইলি হামলায় ৬ কোটি ৮০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ, পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা
তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। এবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সাধারণ মানুষের দেখার সুযোগ দেওয়া হবে। তবে সাধারণ মানুষ কীভাবে এই দৃশ্য দেখতে পারবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৩৬ সালের পর দেশটিতে প্রকাশ্যে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। হেগসেথের বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে, সেনাবাহিনী কীভাবে সাধারণ মানুষকে এই দৃশ্য দেখার সুযোগ দেবে।
অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, পেন্টাগনের পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোথায় বা কীভাবে এই সম্প্রচার দেখা যাবে, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় সাধারণ মানুষ সরাসরি উপস্থিত থাকতে পারবেন, নাকি টেলিভিশন বা অনলাইনে তা দেখানো হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। চলতি সপ্তাহের শুরুতে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সুপারিশ করেছিলেন। ট্রাম্প তাতে অনুমোদন দিয়েছেন। পারনেল আরও জানান, কখন ও কোথায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে, তা সেনাবাহিনীর সচিব ঠিক করবেন।
আরও পড়ুন: ট্রাম্প-সমর্থিত জনতাবাদী জোয়ারে আমেরিকা-ব্রাজিলে বড় ভাটা, ইউরোপের পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে ১৯৬১ সালের পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে। ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুড সেনাঘাঁটির একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে গুলি চালান তৎকালীন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা মেজর নিদাল মালিক হাসান। ওই হামলায় ১৩ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ১২ জন সেনাসদস্য এবং একজন বেসামরিক নাগরিক ছিলেন। আহত হন ৩০ জনের বেশি।
হামলার সময় ফোর্ট হুড ছিল ইরাক ও আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নেওয়া মার্কিন সেনাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছানো বেসামরিক পুলিশ কর্মকর্তারা হাসানকে গুলি করেন। এতে তার শরীরের কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয় এবং তিনি আংশিকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
২০১৩ সালে সামরিক আদালতের একটি জুরি তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। বিচার চলাকালীন হাসান নিজেই নিজের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি কোনো সাক্ষী হাজির করেননি এবং নিজেও সাক্ষ্য দেননি। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও তিনি চ্যালেঞ্জ করেননি।
হাসানের পক্ষে আদালত নিযুক্ত আইনজীবীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, তিনি নিজেই মৃত্যুদণ্ড পেতে চাইছেন। সরকারি কৌঁসুলিদের দাবি, আল-কায়েদার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে হাসান এই হামলা চালিয়েছিলেন। বিচার চলাকালে উপস্থাপিত তথ্যে উঠে আসে, ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করতেন তিনি।
আরও পড়ুন: টঙ্গীতে বিএনপির বিক্ষোভ, নুরুল ইসলাম সরকারের মুক্তির দাবি
এ ছাড়া আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত উগ্রপন্থী ধর্মীয় বক্তা আনোয়ার আল-আওলাকির সঙ্গে অনলাইনে তার যোগাযোগ ছিল। পরে ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় আল-আওলাকি নিহত হন।
অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে সর্বশেষ ১৯৬১ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আর ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। সে সময় এডি স্লোভিক নামের এক সেনাসদস্যকে ফ্রান্সে দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়ার অপরাধে গুলি করে হত্যা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমতি রয়েছে আইডাহো, মিসিসিপি, ওকলাহোমা, সাউথ ক্যারোলাইনা ও ইউটাহ অঙ্গরাজ্যে। মৃত্যুদণ্ডবিষয়ক তথ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সাউথ ক্যারোলাইনায় এই পদ্ধতিতে একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর আগে ১৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে এই পদ্ধতিতে কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।
দেশটিতে সর্বশেষ প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ১৯৩৬ সালে। সে সময় কেন্টাকিতে রেইনি বেথিয়া নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এক শ্বেতাঙ্গ নারীকে ধর্ষণের দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: ডেমোক্র্যাটদের ইমপিচমেন্ট উদ্যোগ ধোপে টিকবে না: মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর হুংকার
যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা প্রায়ই ঘটে। তবে সামরিক স্থাপনায় এ ধরনের হামলা তুলনামূলকভাবে কম। ২০২৫ সালে জর্জিয়ার একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে এক সেনাসদস্যের গুলিতে তার পাঁচ সহকর্মী আহত হন। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০১৯ সালে হাওয়াইয়ের একটি সামরিক স্থাপনায় মার্কিন নৌবাহিনীর এক সদস্যের গুলিতে দুজন নিহত ও একজন আহত হন। একই বছর ফ্লোরিডায় একটি সামরিক স্থাপনায় সৌদি আরবের এক সামরিক প্রশিক্ষণার্থীর গুলিতে তিনজন নিহত হন।
২০১৫ সালে টেনেসির দুটি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে চারজন মেরিন সেনা ও একজন নৌবাহিনীর সদস্যকে হত্যা করেন এক বন্দুকধারী। পরে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই জানায়, একটি বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি হামলা চালিয়েছিলেন।
এ ছাড়া ২০১৩ সালে ওয়াশিংটনের নেভি ইয়ার্ডে এক বন্দুকধারীর হামলায় ১২ জন নিহত ও আটজন আহত হন। পরে পুলিশ গুলি করে ওই হামলাকারীকে হত্যা করে।
আরও পড়ুন: কাশ্মীরে হারিয়ে যাচ্ছে ‘লাল সোনা’ খ্যাত জাফরান
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন