০৭:১৭ এম
বাংলাদেশে টার্কিশ এয়ারলাইনসের বাংলাদেশে জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) হিসাবে কাজ করছে অ্যারোমেট সার্ভিসের লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এবং অন্যতম কর্ণধার শাহরিয়ার নাসের জাহেদী সম্প্রতি জামায়াতে যোগ দিয়েছেন বলেই ঝিনাইদহে জোর গুঞ্জন চলছে। যদিও শাহরিয়ার নাসের জাহেদী তা অস্বীকার করেছেন। তিনি জামায়াতে যোগ দেন অথবা না দেন, দলটির সঙ্গে জাহেদীর ঘনিষ্ঠতার কথা সকলেরই জানা। এসব তথ্য একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন।
তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। '২৪-এর আমি-ডামি নির্বাচনে জাহেদী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। পরে তিনি স্বতন্ত্র নির্বাচন করে বিজয়ী হন। ২০০৮ সালের আগে, এই জাহেদী বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ২০০৭ সালে এক-এগারোর সময়, তিনি তার বন্ধু তৎকালীন সিজিএস জেনারেল (অব) সিনহা ইবনে জামালীর কল্যাণে ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন। সেই সময়, তার হাতে বিএনপি নেতা মশিউর রহমানসহ বহু নেতা-কর্মী নির্যাতনের শিকার হন। জাহেদী কেবল অ্যারোমেটের কর্ণধার নন, দেশের অন্যতম শীর্ষ ওষুধ কোম্পানি রেডিয়েনটের কর্ণধারও। ঝিনাইদহের সাধারণ মানুষের কথায়, জাহেদী যেখানে ক্ষমতার গন্ধ পান, সেখানে বাসা বাঁধেন। তাদের উদ্বেগ, তাহলে কি জামায়াত শিগগিরই ক্ষমতায় আসবে?
দেশের একটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর মালিকের জামায়াতে যোগ দেওয়ার গুঞ্জন, সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ইঙ্গিত বহন করে বলে অনেকে ধারণা করছেন। জামায়াত এখন নিজেদের গণ্ডির বাইরে গিয়ে সম্পর্ক স্থাপন করছে। এই ঘটনা তার প্রমাণ হতে পারে।
আরও পড়ুন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনের সঙ্গে উইনরক ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ
তবে এই সামান্য সূত্রটির পেছনে আরও গভীর ষড়যন্ত্রের সূত্র রয়েছে। শাহরিয়ার নাসের জাহেদীর জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকার বিষয়টি তুরস্কের সঙ্গে একাত্তরের পরাজিত শক্তির সম্পর্কের একটি উদাহরণ। শুধু টার্কিশ এয়ারলাইনসের জিএসএ নয়, তুরস্ক থেকে আসা জকাত ফান্ডসহ দেশের সঙ্গে একাধিক ব্যবসায় জড়িত জাহেদী। জাহেদীর মতো তুরস্ক কেন্দ্রিক বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী এখন জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রতিদিন জানায়, গত ২৩ বছর ধরে তুরস্কের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি, যা একটি মৌলবাদী দল। ২০০৩ সালে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ক্ষমতায় আসে দলটির প্রধান নেতা রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। তিনি ধীরে ধীরে তুরস্ককে উদার, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে ইসলামপন্থী রাষ্ট্রে পরিবর্তিত করেন। ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর, তিনি তার পদে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট এরদোগান ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী সমর্থকদের ওপর নির্ভরশীল। তার নেতৃত্বে তুরস্কে কট্টর মুসলিম জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, সিরিয়া, লিবিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অঞ্চলে তুরস্কের কৌশলগত স্বার্থ এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে বিভিন্ন বিদ্রোহী বা ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আঙ্কারার যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে। এই কারণেই বাংলাদেশের জামায়াতের সঙ্গে তুরস্কের গোপন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এই সময়ে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে এবং তাদের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। জামায়াতের সঙ্গে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দলের সম্পর্ক প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০১৬ সালে যখন দেশটি জামায়াতের নেতা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচারের রায়ের নিন্দা জানায় এবং রায় কার্যকর না করার জন্য তৎকালীন সরকারকে চিঠি দেয়।
তুরস্কের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ-এর উপদেষ্টা সেলচুক কোলাগলু ২০১৯ সালে মিডল-ইস্ট ইনস্টিটিউটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে এই বিষয়ে লিখেছেন, দেশের ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি ২০১১ সালে ইসলামভিত্তিক রাজনীতির মতাদর্শ গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দলটি, মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে যেমন সমর্থন দিয়েছিল, তেমনি বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর প্রতিও তাদের সমর্থন রয়েছে বলে মনে করেন মি. কোলাগলু।
২০১৬ সাল থেকে তুরস্ক জামায়াতকে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে। অ্যারোমেট এমন একটি প্রতিষ্ঠান। এ সময় তুরস্ক বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কও বৃদ্ধি করে। এক বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক দুই বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ, তুরস্কের কাছ থেকে পিঁয়াজ থেকে শুরু করে সেনা সরঞ্জাম পর্যন্ত কেনা শুরু করে। আওয়ামী লীগ আমলে, তুরস্কের সঙ্গে এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধির সুফল জামায়াত পেয়ে থাকে। এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের আড়ালে তুরস্ক জামায়াতকে পুনরুজ্জীবিত করে। আজকের জামায়াত অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, তুরস্কের ব্রেন চাইল্ড বলেও মনে করা হয়।
আরও পড়ুন: হাসপাতালে সাংবাদিক এনাম সরকারের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিলেন রিজভী
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই এক দশকে (২০১৬-২০২৬) জামায়াত সাংগঠনিকভাবে পুনর্গঠিত হয়েছে। এর পেছনে প্রধান অর্থদাতা ছিল তুরস্কের সঙ্গে ব্যবসা করা বাংলাদেশিরা। তাদের মুনাফার একটি নিদির্ষ্ট অংশ সিআরএসের (করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি) নামে জামায়াত নিয়ন্ত্রণাধীন মাদ্রাসা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়।
তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একে পার্টি) এবং বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী একই মতাদর্শে বিশ্বাসী। এর কারণেই এককালের ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ক জামায়াতের ঘনিষ্ঠ মিত্রতে পরিণত হয়েছে। ১৯২৮ সালে মিসরে ইখওয়ানুল মুসলিমিন (মুসলিম ব্রাদারহুড) প্রতিষ্ঠা করেন হাসান আল বান্না ও সাইয়্যেদ কতুব। ইতিহাসবিদ ফিলিপ জেনকিন্সের মতে, জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদীর মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠা ঘটে। তবে মওদুদী জামায়াত প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৪০ সালে। ১৯৭৯ সালে মওদুদীর মৃত্যুর পর ব্রাদারহুডই হয়ে ওঠে তার দর্শনে বিশ্বাসী ও মতাদর্শে পরিচালিত দলগুলোর ঐক্যের প্রতীক। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে মওদুদীর মতাদর্শে বিশ্বাসী দল। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে এরা জামায়াতে ইসলামী নামে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন নামে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। কয়েকটি দেশে ক্ষমতার শরিক হলেও সুদানে ও তুরস্কে এককভাবে ক্ষমতায় আছে তারা। এসব দলের ওপর ব্রাদারহুডের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও তাদের ওপর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর জামায়াতের প্রতি সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে তুরস্কের বর্তমান সরকার। জুনের প্রথম সপ্তাহে, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশের সফরের সময় জামায়াতের আমিরের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। এর আগে, গত মে মাসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন তুরস্কের হুদা পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান হুসাইন এমির এবং এনজিও বিভাগের প্রধান ফিকির কারাভিল।
জামায়াতের সঙ্গে তুরস্কের বহুমুখী সম্পর্ক এখন দৃশ্যমান। বহু ছাত্রশিবিরের সদস্য উচ্চশিক্ষার জন্য তুরস্কে যাচ্ছে। তাদের বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বৃদ্ধির বেশির ভাগ ফায়দা নিচ্ছে জামায়াত। তুরস্কে জামায়াতের কর্মীদের নিয়মিত রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, তুরস্কের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির আদলে জামায়াতকে আধুনিকীকরণের কাজটা করছে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, বাইরে উদার গণতান্ত্রিক মনোভাব প্রদর্শন, পোশাকে আধুনিকতা, ইত্যাদি নানা বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছে তুরস্কের ক্ষমতাসীনরা। বাংলাদেশে জামায়াতকে ক্ষমতায় আনার জন্য একটি নীলনকশা তৈরি করা হয়েছে। এখন যার বাস্তবায়ন চলছে।
আরও পড়ুন: বিএনপির সারাদেশে র্যালির ঘোষণা ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে
কিন্তু বাংলাদেশে জামায়াতের প্রধান প্রতিপক্ষ হলো তাদের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাস। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক যেমন গভীর পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে তেমনি জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু করতে হবে। জামায়াত এখন উদারতার এবং আধুনিকতার যে রাজনীতির কথা বলছে তা আসলে একটি মুখোশ।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন