০৮:১৫ পি.এম
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থামাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যখন চলমান যুদ্ধ থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেও সাময়িক ভাবে হলেও শান্ত করার চেষ্টা চলছে তখন ইজরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কর্তৃক ফিলিস্তিন, লেবানন ও সিরিয়ায় যুদ্ধ অনবরত চালিয়ে যাওয়ার হুমকি-ই প্রমাণ করছে রাষ্ট্রটির বিলুপ্তি না হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য স্থিতিশীল হওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—এই অঞ্চলে যুদ্ধের শেষ কোথায়? গত কয়েক দশকের ইতিহাস বলছে, যখনই শান্তির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তখনই নতুন সংঘাত সেই সম্ভাবনাকে গ্রাস করেছে। সমালোচকদের একাংশের মতে, ইসরায়েলের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক ও সামরিক নীতিই এই অস্থিরতার অন্যতম চালিকাশক্তি; তাদের ভাষায়, এই রাষ্ট্রটি মধ্যপ্রাচ্যের "ক্যান্সার"-এ পরিণত হয়েছে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত কেবল দুটি রাষ্ট্রের যুদ্ধ ছিল না; এটি দ্রুত এমন এক ভূরাজনৈতিক সংঘর্ষে রূপ নেয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে—ইরানকে দ্রুত নতজানু করানোর যে হিসাব করা হয়েছিল, বাস্তবতা তার সঙ্গে মেলেনি। ইরানের পাল্টা প্রতিরোধ প্রমাণ করেছে যে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সত্ত্বেও দেশটি সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা ধরে রেখেছে। সমর্থকদের দৃষ্টিতে, এই প্রতিরোধই ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের "সিংহ" হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনায় আগ্রহকে অনেক বিশ্লেষক কেবল মানবিক উদ্যোগ হিসেবে দেখেন না। তাদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য, তেলের বাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সংকট, এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা—বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচন—ওয়াশিংটনকে কৌশল পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
কিন্তু যুদ্ধবিরতির ঘোষণা কখনোই প্রকৃত শান্তির নিশ্চয়তা হয়ে ওঠেনি। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—সব পক্ষ কি একইভাবে যুদ্ধ থামাতে আগ্রহী?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu বারবার ঘোষণা দিয়েছেন যে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সামরিক অভিযান চলবে। একই সময়ে লেবানন, গাজা ও সিরিয়ায় সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকার খবর এই ধারণাকে আরও জোরদার করেছে যে যুদ্ধ কেবল একটি ফ্রন্টে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলের অংশে পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যদি যুদ্ধবিরতি বাস্তবে কার্যকরই না হয়, তবে সেই শান্তি উদ্যোগের রাজনৈতিক মূল্য কতটুকু?
সমালোচকদের মতে, ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব এমন এক নিরাপত্তা দর্শনে বিশ্বাস করে, যেখানে সামরিক শক্তির প্রদর্শনই প্রধান ভাষা। তাদের যুক্তি, এই নীতির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা বারবার ভেঙে পড়ছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের সমর্থকেরা বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে থাকায় তারা নিজেদের প্রতিরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করছে। এই দুই বিপরীত অবস্থানের মাঝখানে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে।
ইরানের প্রতিরোধ, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পুনর্বিবেচনা এবং যুদ্ধবিরতির পরও সংঘাত অব্যাহত থাকা—সবকিছু মিলিয়ে একটি বাস্তবতা স্পষ্ট হচ্ছে: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এখন আর একক কোনো দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা অসম্ভব। তবে একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—যদি কূটনীতি ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয় এবং প্রতিটি সংকটের একমাত্র উত্তর সামরিক অভিযান হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যাবে। সেই আগুন শুধু এই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর ধোঁয়া পৌঁছে যাবে বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক রাজনীতির প্রতিটি প্রান্তে।
ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যুদ্ধ শুরু করা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু যুদ্ধের সমাপ্তি এবং তার রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন। তাই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্যও একটি কঠিন পরীক্ষা।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই যুদ্ধের আপাত ইতি টানতে চাচ্ছেন তখন মধ্যপ্রাচ্যের ক্যান্সার হিসেবে খ্যাত ইসরাইলের দুর্নীতিবাজ ও যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, এই যুদ্ধ কখনোই থামবে না। তার অর্থ হচ্ছে ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থ তালমুদ অনুযায়ী ইসরাইল রাষ্ট্রটি একটি নির্দিষ্ট সময় পর ধ্বংস হয়ে যায়। আর সেটি রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েই এই প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসেছিলেন এবং ধারণা করা হচ্ছে এই যুদ্ধ অনবরত চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ইজরায়েল তার নিজের ধ্বংস ডেকে না আনা পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের আগুন নিভবে না কিংবা ইসরাইল রাষ্ট্রটি মানচিত্র থেকে বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধ হবে না এমনকি শান্তিও ফিরবে না এমন আশঙ্কা আজকের দিনে করা মনে হয় অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন