০৫:১৩ পি.এম
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে কিছু দিন ধরে চলা তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এই প্রতিকূল আবহাওয়ায় সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন চরাঞ্চলের শ্রমজীবী নারীরা। দেখা যাচ্ছে, তীব্র গরমে মাঠে কাজ করার ফলে নারীদের বোধগম্যভাবে মাথা ঘোরা ও অতিরিক্ত দুর্বলতার মধ্যে জরায়ুজনিত ইনফেকশন ও ত্বকের বিভিন্ন জটিল রোগ প্রকট আকার ধারণ করছে। চিকিৎসকদের মতে, মূলত অসচেতনতা এবং লোকলজ্জার কারণে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ছে।
স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্বারা জানানো হচ্ছে, গরমের এই সময়ে চরের নারীদের মধ্যে মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI) এবং বিভিন্ন চর্মরোগের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। চরের বাতাসে বালুকণা বেশি থাকার কারণে এবং তীব্র রোদে ত্বক পুড়ে যাওয়ার ফলে চুলকানি, লাল দানা ও একজিমার প্রকোপ বাড়ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, তীব্র গরমে চরের নারীদের সুতি ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা উচিত। প্রজনন স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে শরীর সর্বদা পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং দিনে অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার নিরাপদ পানি অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী স্যালাইন পান করতে হবে। এই গরমে অতিরিক্ত ঘাম এবং দীর্ঘ সময় ভেজা কাপড় পরে থাকার কারণে কুচকি, বগল এবং আঙুলের ফাঁকে ছত্রাকজনিত (ফাঙ্গাল) ইনফেকশন হচ্ছে। ঘামের কারণে চামড়ায় লাল দানা উঠছে, যা তীব্র চুলকানি ও জ্বালাপোড়া তৈরি করে।
আরও পড়ুন: উখিয়ায় ১৫ ঘণ্টা পরও জ্বলছে গ্যাসের আগুন, ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ
মাঠে কাজ করার পর শরীর ভালো করে মুছে শুকনা রাখা জরুরি, এবং ঘামে ভেজা কাপড় দ্রুত বদলে ফেলা প্রয়োজন। দিনে অন্তত একবার পরিষ্কার পানিতে এক চামচ লবণ মিশিয়ে অথবা সাবান দিয়ে ভালো করে গোসল করতে হবে। চরের নলকূপের পানিতে অনেক সময় আয়রন বা বালুকণা থাকে। পানি পরিষ্কার করতে এক কলসি পানিতে সামান্য ফিটকিরি দিয়ে ২-৩ ঘণ্টা রেখে দিলে ময়লা নিচে পড়ে যাবে। পরে ওপর থেকে পরিষ্কার পানি ছেঁকে ব্যবহার করতে হবে। তবে গোসলের সময় আক্রান্ত স্থানে অতিরিক্ত ক্ষারযুক্ত সাবান ব্যবহার না করার পরামর্শ রয়েছে চিকিৎসকদের।
চিকিৎসকরা জানান, চরের বেশিরভাগ নারী সুতি কাপড় ব্যবহার করেন। এই কাপড় ব্যবহারের পর পরিষ্কার পানি ও সাবান দিয়ে খুব ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। অনেক সময় লোকলজ্জার ভয়ে নারীরা ভেজা কাপড় ঘরের কোণে বা অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে জায়গায় লুকিয়ে রাখেন, যা কাপড়ে মারাত্মক জীবাণু ও ছত্রাক সৃষ্টি করে। তাই কাপড় অবশ্যই সূর্যের আলোতে শুকাতে হবে। একটি সুতি কাপড় ধুয়ে সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ বার ব্যবহার করা যাবে। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার জন্য ক্ষারযুক্ত কাপড়ের সাবান বা অতিরিক্ত সুগন্ধি সাবান ব্যবহার করা যাবে না। এতে ত্বকের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ইনফেকশন বাড়ে। এর পরিবর্তে কেবল পরিষ্কার কুসুম গরম পানি বা হালকা নিমপাতা সেদ্ধ পানি ব্যবহার করা নিরাপদ।
তীব্র গরমের সাথে নারীদের জরায়ু ও প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্কের বিষয়ে চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স ও ভায়া ইনচার্জ মোছা. শারমিন সুলতানা বলেছেন, অতিরিক্ত গরমে শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বের হয়। চরের নারীরা যখন দীর্ঘ সময় মাঠে কাজ করেন, তখন প্রজনন অঙ্গের চারপাশ ঘামে ভেজা থাকে। অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও গরমে সেখানে ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এছাড়া চরে কাজ করার সময় দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকানো অথবা পিরিয়ডের সময় অপরিচ্ছন্ন ভেজা কাপড় ব্যবহারের কারণে জীবাণু সহজেই জরায়ুর মুখে এবং মূত্রনালীতে প্রবেশ করে। ফলে জরায়ুতে ইনফেকশন, পেলভিক ইনফ্লামেটরি ডিজিজ (PID), অতিরিক্ত সাদা স্রাব ও তীব্র চুলকানির সৃষ্টি ঘটে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চিলমারী হাসপাতালে গেল মে মাসে জরায়ু সংক্রান্ত প্রাথমিক পর্যায়ের সেবা নিয়েছেন ১৬ জন এবং চলতি জুন মাসের প্রথম ১০ দিনেই চিকিৎসা নিয়েছেন ১১ জন।
আরও পড়ুন: তাহিরপুরে প্রবাসীর স্ত্রী ও পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে উধাও নাজমুল, পরিবার উদ্বিগ্ন
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার চিলমারী, নয়ারহাট ও অষ্টমীরচর এলাকায় পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এই তীব্র গরমে আবাদি জমিতে দীর্ঘ সময় কাজ করছেন। ফলে তারা দ্রুত পানিশূন্যতায় ভুগছেন, যা তাদের প্রজনন স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।
চিলমারী ইউনিয়নের চরাঞ্চলের বাসিন্দা মিমি খাতুন (ছদ্মনাম) জানিয়েছেন, ‘এমনিতেই গরমে চরের বালু দিয়ে হাঁটা যায় না। তার ওপর পেটের ব্যথায় টিকতে পারি না। লজ্জায় এসব কথা কাউকে বলা যায় না। গরম বাড়ার পর থেকে শরীর সম্পূর্ণ দুর্বল হয়ে গেছে, মাঝে মাঝে চোখও অন্ধকার হয়ে আসে।’
একই এলাকার রুপা খাতুন (ছদ্মনাম) বলেছেন, ‘সারাদিন মাঠে কাজ করতে হয়। প্রচণ্ড গরমে শরীর ভিজে থাকে, অনেক সময় কাপড় পরিবর্তন করার সুযোগও পাই না। কয়েকদিন ধরে চুলকানি ও জ্বালাপোড়ার সমস্যা বাড়ছে। কিন্তু সংসারের কাজের চাপে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া হয় না।’
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অফিস জানান, চলতি জুন মাসের প্রথম ১০ দিনে কুড়িগ্রাম জেলায় গড় তাপমাত্রা ছিল ৩০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময়ে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪.৫ এবং গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে গড় আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৭১ শতাংশ।
আরও পড়ুন: সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের সঙ্গে ‘দাদা ভাই বাহিনী’র বন্দুকযুদ্ধে ৫ জেলে উদ্ধার
আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক শামছুদ্দোহা বলেছেন, বর্তমানে কুড়িগ্রাম জেলার সর্বোচ্চ আর্দ্রতার পরিমাণ ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত থাকছে। ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার তুলনায় মানুষের শরীরে গরমের অনুভূতি অনেক বেশি হচ্ছে এবং রাতেও গরম কমছে না। উচ্চ আর্দ্রতার কারণে শরীরের ঘাম সহজে শুকায় না, যার ফলে অস্বস্তি ও গরমের অনুভূতি আরও তীব্র হচ্ছে।
স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মো. বেলাল হোসেন এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের এসএসিএমও জিয়াউল হক জানান, চলমান তাপপ্রবাহের কারণে চরাঞ্চলের নারীদের মধ্যে জরায়ু ও ত্বকজনিত সমস্যা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। অনেক নারী লজ্জার কারণে যখন চিকিৎসা নিতে চান না। তাই তাদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. প্রান্ত সরকার জানিয়েছেন, এই তীব্র গরমে চরের নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুতি ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা ও পরিচ্ছন্ন থাকা অত্যন্ত জরুরি। দৈনিক অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার নিরাপদ পানি অথবা পর্যাপ্ত স্যালাইন পান করতে হবে। যেকোনও স্বাস্থ্যগত সমস্যায় অবহেলা না করে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগাযোগ করে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ তিনি দেন।
আরও পড়ুন: কুমিল্লার আদালতে মহিলা আ.লীগ নেত্রীর বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ, আটক
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন