০৩:৫৪ এম
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে ৫ আগস্টের পরবর্তী দফা অভিযানগুলি চললেও এখনো মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পুলিশ তালিকাভুক্ত গডফাদারদের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
নামগুলো হলো- মনু ওরফে গাল কাটা মনু, ইমতিয়াজ, শাহ আলম ও বিল্লু। অভিযোগ রয়েছে যে, তারা একত্রে জেনেভা ক্যাম্পে খুচরা মাদক কারবারিদের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এছাড়া, সালাম, নেটা সেলিম, ইরফান, লালনসহ বিভিন্ন তালিকাভুক্ত গডফাদার ক্যাম্পে মাদক ব্যবসার নেতৃত্ব দেয়। প্রত্যেকের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জনের বেশি সহযোগী রয়েছে, যারা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় ঘুরে ঘুরে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করে। মাদক কিনতে তাদের কাছ থেকে কখনও কখনও লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষকে দেখা যায়, অনেকটা রিলিফ পণ্যের মতো।
এদিকে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক অভিযানে এই মরণনেশার লেনদেন নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দীন কালের কণ্ঠকে জানান, কিছু গডফাদার গ্রেপ্তার হয়েছে, কিন্তু যারা এখনও গ্রেপ্তার হয়নি, তাদের ধরার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে তারা থানায় তালিকাভুক্ত মাদক কারবারির তালিকায় রয়েছে এবং তাদের ধরা পড়ার অভিযান চলছে।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে নলকূপ খননের স্থান থেকে গ্যাসের আগুন, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে
পুলিশ জানায়, সর্বশেষ সোমবার রাতে ক্যাম্পে অভিযান চলাকালীন তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায় যে, মাদক গডফাদারদের বিরুদ্ধে আধিপত্য বজায় রাখতে সহযোগীদের মাধ্যমে তারা বিপুল অস্ত্রের মজুদ করেছে, যার ফলে মাঝে মধ্যে সংঘর্ষ ঘটছে। এর ফলে এলাকার নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
ধারণা করা হচ্ছে, মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্প দীর্ঘ দিন ধরে আতঙ্কের জনপদ হয়ে উঠেছে। এখানে কেবল মাদক কারবারই নয়, প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কিত অবস্থায় রয়েছেন। মাঝে মাঝে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হলেও কিছুদিন পরে পূর্বের পরিস্থিতি ফিরে আসে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, মোহাম্মদপুর তার এলাকার আতঙ্কের আড়ালে পাকিস্তানি নাগরিকদের আবাসস্থল। সেখানে মাদক খুব সহজে পাওয়া যায় আর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও ক্রেতা। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যদি না হয়, তবে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।
বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে জানা যায়, মোহাম্মদপুর বিহারী ক্যাম্পসহ আশপাশের এলাকায় অপরাধমূলক পরিস্থিতি হওয়ার কারণে পুলিশ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে। গত সোমবার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে র্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। মাদক অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে চার ঘণ্টাব্যাপী এই বিশেষ অভিযানে ১৬ জনকে আটক করা হয়, তবে এর মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের গডফাদাররা নেই। আবার, মোহাম্মদপুর থানার পুলিশ সূত্র এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে যে, মাদক বিরোধী অভিযানে অফিসারসহ তিন বাহিনীর বিশাল বহর অংশ নিয়েছে।
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানাচ্ছে, গত ৩০ এপ্রিল থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। নতুন সরকারের ক্ষমতায় আসার পরে মাদকদের বিরুদ্ধে কঠোর যুদ্ধ শুরু হয়েছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আইনগত দুর্বলতার কারণে অনেক অপরাধীকে আটক করার পর দীর্ঘ সময় জেলে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ক্যাম্পের বাসিন্দাদের পাশাপাশি পুলিশ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যে নেতৃবৃন্দ শাহ আলম নামের এক নিরাপরাধ তরুণকে মাদক অপরাধীদের হাতে খুন করেছে। তাকে নির্মমভাবে চাপাতি দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। গত এক বছরের মধ্যে এই মাদক ব্যবসায়ীরা আরও পাঁচজনকে খুন করেছে এবং অর্ধশতাধিক লোক চাপাতির কোপে ও গুলিতে আহত হয়েছেন, এর মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ক্যাম্পের অন্তত ৮০ শতাংশ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখন মাদকে জড়িয়ে পড়েছে। তবে ক্যাম্পের বাসিন্দারা বলেন, ক্যাম্পে দারিদ্র্য ও বেকারত্বের পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে। সম্প্রতি, পুলিশ গোয়েন্দা অনুসন্ধান চালিয়ে জানিয়েছে যে, ক্যাম্পের ৮০ শতাংশ বাসিন্দা মাদক ব্যবসায় জড়িত। জামিনে থাকা এবং অন্তত ২০ জন শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে, যারা ক্যাম্পে নেই। তারা শিশু, কিশোর ও নারীদের ব্যবহৃত করছে।
পুলিশ জানায়, গত এক বছরে মোহাম্মদপুর থানায় ৬০ শতাংশ মামলা মাদককে কেন্দ্র করে হয়েছে। শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকেই ৫ আগস্টের পর যৌথ বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছিল। তবে বেশিরভাগ জামিনে বের হয়ে পুনরায় মাদক ব্যবসা শুরু করেছে। বুনিয়া সোহেল ৩৬ মামলার আসামি, অন্যদের বিরুদ্ধে ১০ থেকে ১২টি করে মাদক সংক্রান্ত মামলা রয়েছে।
আরও পড়ুন: সেনাপ্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ, এলএফটি-২০২৬ সফলভাবে সম্পন্ন
এক বছরে নিহতদের মধ্যে, গত বছরের ৬ আগস্ট ক্যাম্পে গুলিতে শাহেন শাহ নামের এক যুবক মারা যান। একই দিনে শুভ নামের আরেক যুবক গলায় গুলিবিদ্ধ হন। এর আগে শাহ আলম নামে এক তরুণকে হত্যা করা হয়েছিল। পরে ১৭ আগস্ট থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়, যা ২৩ আগস্ট পর্যন্ত চলেছিল। আবার ৩০ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংঘর্ষ হয়। ৪ সেপ্টেম্বর সোহেলের গুলিতে অটোরিকশাচালক সাদ্দাম হোসেন সনু মারা যায়। ঘটনার পর ২২ সেপ্টেম্বর এবং পরদিন সকাল পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলতে থাকে। এর মধ্যে নাগিন বেগম ও চারকো ইরফান গুলি বর্ষণের শিকার হন। ২৪ সেপ্টেম্বর গুলিবিদ্ধ সাগর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সবথেকে আগে ৩১ মে ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলিতে রাসেল নামে এক শিশু মারা যায়।
জানা গেছে, ক্যাম্পের বাসিন্দারা বলছেন, বুনিয়া সোহেল মোটরসাইকেলে করে এসে ককটেল ফাটিয়ে চলে যায় এবং সেই থেকে ক্যাম্পের বিভিন্ন জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটছে।
ক্যাম্পের বাসিন্দাদের মতে, বর্তমানে এই ক্যাম্পের মাদক নিয়ন্ত্রণকারীদের মধ্যে বুনিয়া সোহেলের লোকজন ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরে মাদক কারবার করছে। এছাড়া চুয়া সেলিমের এলাকা এবি-ব্লক পাক্কা ক্যাম্পে মাদক কারবার চলছে।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে জখম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন