প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ফ্রান্স বিএনপি ইউরোপে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম প্রধান ঘাঁটিতে পরিচিত। গত ১৭ বছর ধরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা এই সংগঠন এখন নেতৃত্ব সংকটে রয়েছে।
কমিটি বিলুপ্তির দীর্ঘ সময় পরেও নতুন নেতৃত্ব না আসায় সংগঠনের ভেতরে হতাশা, বিভক্তি ও অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন যে, বছরের পর বছর অপেক্ষার পরেও নতুন কমিটি গঠন না হওয়ার ফলে সংগঠনের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এই কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে অনাস্থা, হতাশা ও অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে। একসময় প্রবাসে বিএনপির অন্যতম শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে পরিচিত এই সংগঠনের কর্মসূচিগুলিতে ব্যাপক নেতাকর্মীর উপস্থিতি ছিল, কিন্তু বর্তমান চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
এটি দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী পালনেও প্রতিফলিত হয়েছে। অতীতে ফ্রান্স বিএনপির সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এক মঞ্চে উপস্থিত থাকলেও এবারে ঐক্যের চিত্র লক্ষ্য করা যায়নি।
গত ১০ জুন সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুনেদ আহমেদের নেতৃত্বে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে একটি স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সেখানে সংগঠনের অনেক শীর্ষ নেতা ও কর্মীর অনুপস্থিতি বর্তমান বিভক্তির চিত্রকে আরো স্পষ্ট করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ ২০১৪ সালে সৈয়দ সাইফুর রহমানকে সভাপতি এবং এম এ তাহেরকে সাধারণ সম্পাদক করে কেন্দ্র থেকে ফ্রান্স বিএনপির কমিটি অনুমোদন করা হয়েছিল। সেই সময় বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান ইউরোপ অঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে সাইফুর রহমান এবং এম এ তাহেরের নেতৃত্বে ফ্রান্স বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
এদের নেতৃত্বে সংগঠনটি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রের নির্দেশে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও ফ্রান্স বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ার হোসেন খোকন বিদ্যমান কমিটি ভেঙে দেন।
এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও নতুন কোন কমিটি ঘোষণা করা হয়নি।
দলীয় সূত্রটি বলেছে যে, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান ফ্রান্স বিএনপির সাংগঠনিক বিষয় তদারকি করতেন। তিনি সহকারীদের নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য কমিটি গঠনের চেষ্টা করলেও স্থানীয় পর্যায়ের অনৈক্য, গ্রুপিং এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন যে, ফ্রান্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য দীর্ঘদিন কমিটি ঝুলিয়ে রেখেছেন। এমন অবস্থায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
পরে ফ্রান্স বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্ব পান সাবেক ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেন খোকন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এই নেতা দায়িত্ব গ্রহণের পর সংগঠন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তাঁর কার্যক্রম মূলত অনলাইন বৈঠক ও জুম সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
নেতাকর্মীরা মনে করেন, ফ্রান্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে সাংগঠনিক সংকট নিরসনে সরাসরি মাঠপর্যায়ে এসে পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাকে ফ্রান্সে এসে দৃশ্যমান কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফ্রান্স বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেছেন, আমরা প্রবাসে কষ্টার্জিত অর্থের একটি অংশ দলের জন্য ব্যয় করি। পরিবার-পরিজনের সময় থেকে সময় বের করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিই। অথচ আমাদের সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় নেতারা শুধু আশ্বাস দিয়েই যাচ্ছেন। আমাদের নিয়ে আর তামাশা করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, ফ্রান্স বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী বছরের পর বছর ধরে একটি গ্রহণযোগ্য কমিটির অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না।
কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর রাজনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখার লক্ষ্যে একটি জুম সভায় সাবেক সভাপতি আহসানুল হক বুলুকে সমন্বয়কের দায়িত্ব দিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে ১৬ সদস্যের একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, অসহযোগিতা ও সমন্বয়ের অভাবে কমিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
এদিকে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর ফ্রান্সে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একাধিক সূত্র জানায়, পদ-পদবি ও সাংগঠনিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র হয়েছে। এর ফলে সংগঠনের সামগ্রিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ছে।
সম্প্রতি কয়েকটি দলীয় কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রকাশ্য বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘটনায় সাধারণ নেতাকর্মীরা যেমন বিব্রত হচ্ছে, তেমনি সংগঠনের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিভিন্ন জাতীয় দিবস, দলীয় কর্মসূচি ও স্মরণসভায় অংশগ্রহণের ব্যাপারটি কমে যাওয়ার বিষয়টিও এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দায়িত্বশীল নেতা বলছেন, ফ্রান্স বিএনপির বর্তমান অবস্থার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তাই অনেকাংশে দায়ী। শুরু থেকেই কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না।
সদ্য বিদায়ি সাধারণ সম্পাদক এম এ তাহের বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের আগে ও পরে কেন্দ্রের নির্দেশনায় পরিচালিত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে প্রবাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ফ্রান্স বিএনপি। দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফ্রান্স বিএনপির নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের হতাশা দূর করতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান।
সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রেজাউল করিম রেজা বলেছেন, প্রবাসে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ফ্রান্স বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি যত দ্রুত গঠন করা হবে, তত দ্রুত ফ্রান্সের জাতীয়তাবাদী ব্যক্তিগত, গোষ্ঠী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তির মধ্যে ঐক্য সুদৃঢ় হবে। পাশাপাশি, প্রবাসে বর্তমান সরকারের পক্ষে ইতিবাচক জনমত গঠনেও ফ্রান্স বিএনপি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
অন্যদিকে সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুনেদ আহমেদ বলেছেন, ফ্রান্স বিএনপির কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কোনো হাইব্রিড বা সুবিধাবাদী ব্যক্তিদের স্থান দেওয়া উচিত নয়। যারা দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় থেকেছেন এবং নিজেদের শ্রম, ত্যাগ, নির্যাতন ও রক্তের বিনিময়ে ফ্রান্সে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করে রেখেছেন, তাদের নিয়েই কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। ইউরোপের এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে আমরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করিনি।
নেতাকর্মীরা জানান, সাংগঠনিক কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি অত্যন্ত জরুরি। পূর্ণাঙ্গ কমিটি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সাংগঠনিক তৎপরতা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সম্প্রতি দূতাবাস আয়োজিত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ঘিরেও বিভিন্ন সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে।
ফ্রান্স বিএনপির সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কবির আহমেদ বলেন, তিনি ১৯৮৪ সাল থেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সংগঠনের শৃঙ্খলার স্বার্থে অনেক কিছু প্রকাশ্যে বলতে চান না উল্লেখ করে বলেন, সমাজ ও সংগঠনের কার্যক্রমকে গতিশীল করতে কেন্দ্রের নির্দেশনায় একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে কেন্দ্র থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত ফ্রান্স বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ার হোসেন খোকনের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফ্রান্স বিএনপির আগামী নেতৃত্বে যাদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সাবেক ছাত্রনেতা মাহবুবুল আলম রাঙ্গা, সাবেক সহ-সভাপতি কবির আহমেদ পাটোয়ারী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ তাহের, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রেজাউল করিম রেজা, জুনেদ আহমেদ ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কবির আহমেদ।
বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিকট অতীত থেকে এখন পর্যন্ত সংগঠনকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ তাহের, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রেজাউল করিম রেজা এবং জুনেদ আহমেদ।
ফ্রান্স বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে অধিকাংশ নেতাকর্মীর প্রত্যাশা একটাই—দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বিভক্তি ও সাংগঠনিক অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে আরো সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায় ফ্রান্স বিএনপির সাংগঠনিক সংকট আরো গভীর হতে পারে, যা বিএনপির আন্তর্জাতিক সাংগঠনিক কাঠামোর জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন